কথায় আছে লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো? ক্ষমা কি করা যায়, যদিও বা যায়... সেটা কি ভোলা সম্ভব? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় একটা বড় ভুমিকা নেয়, দিন যেতে যেতে ঘটনার অনুভুতির তীক্ষতা কমতে থাকে, আমরা মনে করি ‘ভুলে গেছি’; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য অনুরূপ কিছু হলে বা মনে পড়লেই দগদগে ভাব নির্লজ্জের মতন বেরিয়ে পরে।
হ্যাঁ, আমিও বলছি, ভালো থাকতে গেলে এই –“ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট” যাদুর মতন কাজ করে। একটা সত্যি ঘটনা বলি আজকে, আমার জীবনের। আমার বাড়ির পাশেই একটা কোচিং সেন্টারে আমার ছেলে পড়ত। ঘটনাক্রমে, সেন্টারহেডের ছেলেও আমার ছেলেরই ক্লাসের বন্ধু। প্রচলিত আছে, সেই সেন্টারহেড (নাম ধরে নিই ‘ক’বাবু) ভালো ছাত্রছাত্রী ছাড়া সেই সেন্টারে পড়ান না। তাই, আমার ছেলে যখন ক্লাস সেভেন (ছেলে আমার বরাবরই ৬০% পাওয়া – ছোটবেলায় লারনিং ডিসঅর্ডার ছিল) তখন তিনি তাকে যোগ্য মনে করেন নি সেই সেন্টারের। ক্লাস নাইনের সময়, আমি দেখলাম, ওর ক্লাসের অনেকজন ওই সেন্টারেই পড়ে আর বাড়ির পাশে বলে, আমারও সুবিধে হবে, অনেকগুলো পথ খরচ বেঁচে যাবে... এইসব ভেবে আবার গেলাম ‘ক’ বাবুর কাছে, অনুরোধ করলাম আমার ছেলেকে ভর্তির জন্য; বদলে একগাদা বকর বকর শুনে; আলটিমেটলি রাজি করিয়ে এলাম। বন্ধুদের সাথে পড়তে গিয়ে ছেলে খুশি, তাই ছেলের মা-ও খুশি। আমি মানুষটা একটু বাউন্ডুলে, খুব একটা সামাজিক নিয়মের ধার ধারি না (আমি বলছি না যে ভালো করি বা খারাপ। নিজেকে যারপরনাই এক্সট্রা এবং অরডিনারি মনে করি)। তাতান, আমার ছেলে, মাঝে মধ্যে মুখ ফস্কে বলে দিত, ওর স্যার, সেই ‘ক’ বাবু আমার কথা খুব বলেন – ‘মা দেখে না? রাত জেগে পড়ায় না?’ আমি হেসে উড়িয়ে দিতাম। একদিন হয়েছে কি, তাতানের এক বন্ধু আমাদের বাড়ি আসে, কোনও নোটসের ব্যাপারে। স্বভাবমতন জিজ্ঞেস করি তার পড়াশোনা কেমন চলছে, কোচিং এ ক্লাস কেমন হচ্ছে, তাতান কি করে? কথায় কথায় সে বলে ফেলে, ‘ক’ বাবু নাকি আমাকে নিয়ে সকলের মধ্যে ভারি সমালোচনা করেন – আমি কোথায় যাই, কি কি করি... আমার জন্যই নাকি আমার ছেলের কোনও উন্নতি হচ্ছে না...ব্লা ব্লা ব্লা..... মাথার মধ্যে যেন আগ্নেয়গিরি ফাটল। তাতান ওর বন্ধুর সাথে পড়তে চলে যাবার পর, বেশ খানিকক্ষণ দুর্দান্ত কান্না চলল।তারপরেই কোমর বাঁধলাম একবার গিয়েই একটা হেস্তনেস্ত করে আসি।মুখেচোখে জল দিয়ে, রেডি হয়ে বেরব, ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল – আর একবার ভাবতে। ভাবতে বসে খুব কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল একমাত্র ওনাকে আচ্ছা করে কথা শুনিয়ে না আসলে শান্তি নেই।জল খেলাম, দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বার কয়েক লম্বা শ্বাস নিলাম আর তারপর খাতা-কলম নিয়ে বসলাম ঘটনার পোস্টমর্টেম করতে। ঘটনা মানে এই নয়- উনি কি বলেছেন, পোস্টমর্টেম করছিলাম, আমার কেন এত কষ্ট হচ্ছে, তাই নিয়ে। জানেন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কি বলল – দেখলাম, আমি বড্ড বেশি রিঅ্যাক্ট করে ফেলছি। জীবন চলার উদাহরণ মনে পড়েছিল, রাস্তার কুকুর চিৎকার করলে কি আমরা মুখ ঘুরিয়ে চেঁচাই? না, কারণ আমরা রিঅ্যাক্ট করি না, সামনের দিকে হাঁটতে থাকি, রেস্পন্ড করি। হ্যাঁ, এইটা মনে করেই দেখলাম বেশ হাল্কা লাগছিল। আমার ‘আমি’কে কি অন্য মানুষের কাছ থেকে অ্যাপ্রুভাল নিতে হবে কি ভালো- কি খারাপের? এইটা ভাবা = সেই মানুষটাকে মাথায় নাচতে দেওয়া। জয়তি ইস দ্য বেস্ট, জয়তি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে - নিজে নিজেকে বলার পরেই দেখলাম সেই রাগ, সেই অস্বস্তি আস্তে আস্তে কর্পূরের মতন উবে গেল। আর যে ঘটনাটা ঘটল- তা হল, জয়তি জেনে গেল, সে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে, শি ইস পাওয়ারফুল।
এইরকম ঘটনা তো আমাদের সঙ্গে আকছার হয়; একবার পরখ করে দেখতে পারেন। আমি এখন যেটা ভাবি, তা হল, আমরা সবসময় নিজেদেরই কষ্ট দিই অন্যের উপর রাগ করে, অভিমান করে। মনে করি, ও এটা বলেছে, ও এটা করেছে – তাই আমার খারাপ লেগেছে, তাই আমার এত কষ্ট ....... প্রথমতঃ ক্ষমা করার তো প্রশ্নই ওঠে না; উচিৎ শিক্ষা দেব, দেখিয়ে দেব এগুলোর সাথে চলে এই ঘটনা নিয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা (পরনিন্দা-পরচর্চা)। তাই কি না ?
একটু গভীর ভাবে ভাবলেই কিন্তু দেখা যায়, ক্ষমা করার কথা ভাবার সময় যে অনুভুতিটা সাধারণ ভাবে কাজ করে – তা হল, আমি সেই মানুষটার থেকে উন্নত এবং ওকে ক্ষমা করে ধন্য করে দিচ্ছি। কি বলেন, কিছুটা কি ঠিক বলছি? এখন, একবারের জন্যও যদি এরকম ভাবা যায় যে – “আমার ভালো থাকার রিমোট আমার কাছেই আছে। আমি ‘এইসব’ ভেবে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছি, খারাপ লাগাচ্ছি – আমি নিজের কাছেই ক্ষমাপ্রার্থী। এইরকম ভাবনা ভেবে আর নিজেকে কষ্ট দেব না”; ‘স্ব’-কে ক্ষমা করলেই স্বক্ষম হওয়া যায়, ভুলে যাওয়া সহজ হয়ে যায় – আর এইটাকেই আসলে ‘ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট’ বলা হয় – জীবনে ভার কমানো, হাল্কা হবার এটি একটি অনন্য সাধারণ উপায়।
এই সুত্রে, হাওয়াই দ্বীপের এক বন্দীশালার গল্প বলি।
১৯৮৪ সালে, হাওয়াই দ্বীপের স্টেট হসপিটালে মানসিক চিকিৎসক হয়ে আসেন ডঃ হিউ লেন। এই মানসিক হাসপাতালটি আসলে একটি বন্দীশালা যেখানে সমস্ত কুখ্যাত অপরাধীদের রাখা হয়েছে। ৩৫জন অপরাধীদের অপরাধ (খুন, ধর্ষণ, এবং অন্যান্য) জঘন্যতম এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ছিল। ডঃ হিউএর আগে যতজন ডাক্তার এসেছেন, তারা কেউই বেশিদিন টিকতে পারেন নি। হাসপাতালের সমস্ত স্টাফরাও আবাসিক রোগীদের প্রতি অত্যন্ত ঘৃণা পোষণ করে, কারোরই কোনোরকমের ধ্যন্যাত্মক আবেগ নেই তাদের প্রতি এবং স্বাভাবিক ভাবেই কাজের প্রতিও। আবাসিকরা (অপরাধীরাও)নিজের সহ-আবাসিকদের সাথেও প্রতিহিংসামূলক কার্যকলাপে যুক্ত ছিল। তাদের হিংস্রতা মোকাবিলা করতে প্রতিনিয়ত বলপ্রয়োগ করা হত, শেকল বেঁধে রাখতে হত অনেককেই। এইরকম অবস্থার জন্য ওদের খুব কাছে গিয়ে ওদের সাথে কাজ করার সাহস এবং ইচ্ছা কারোরই ছিল না। এ হেন পরিবেশে ডঃ হিউ আসেন সেখানে এবং ১৯৮৭ সালে, উনি আসার মাত্র তিন বছরের মধ্যে সেই হাসপাতালটি ‘কারাবাস’ থেকে জনসাধারণের জন্য হয়ে যায়, সেই ৩৫জন অপরাধীরা নিজেদের ভেতরে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে হিংস্র থেকে জেনারেল ওয়ার্ডে ট্রান্সফার হয়ে যায়। শুধু তারাই নয়, সেই হাসপাতালের স্টাফরাও নিজেদের কাজ ভালবাসতে শুরু করে, কামাই কমে যায়, নিয়মানুবর্তিতাও নিদর্শনকারী হয়।
তো, এখন প্রশ্ন হল, ডঃ হিউ লেন কি করেছিলেন?
ডাক্তারি পড়া শেষ করে ডঃ লেন আত্ম-পরিশোধন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে – ‘তুমি যা খুঁজছ, সেটাও তোমায় খুঁজছে’,আমাদের সুকুমারবাবুও বলে গেছেন; ‘ এই দুনিয়ায় সকল ভালো, আসল ভালো নকল ভালো, সস্তা ভালো দামী ভালো, তুমিও ভালো, আমিও ভালো’ – মানে, ভালো খুঁজলে, ভালো দেখলে, সবই ভালো; এই আর কি..... যা হোক, যেটা বলছিলাম, ওনার সাথে আলাপ হয় ‘মোরনা নালামাকু সিমোনা’র। ১৯৮৩ সালে হাওয়াই সরকার মোরনাকে ‘লিভিং ট্রেসার অফ হাওয়াই’ সম্মানে ভূষিত করে। মোরনা সিমোনা, একজন সাধারণ মহিলা একটি অতি সহজ এবং অসাধারণ পদ্ধতি ব্যবহার করে সকলকে আত্ম-পরিশোধনে সহায়তা করতেন। স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল এমনকি ইউনাইটেড নেশনের মানুষদেরও উনি শিখিয়েছিলেন এই সহজ পদ্ধতি। হিউ,১৯৮২ সালে মোরনার শিষ্যত্ব গ্রহন করেন এবং ১৯৯২তে মোরনার দেহত্যাগ পর্যন্ত তার সাথেই ছিলেন।
১৯৮৭ সালে, হাওয়াই স্টেট হাসপাতালের এই অভূতপূর্ব ঘটনার পরে সকলে জিজ্ঞাসা করে ডঃ হিউকে যে কি ম্যাজিক করা হয়েছিল?
একটি সাংবাদিক সম্মেলনে হিউ বলেন, “আমি কোনও পেশেন্টদের উপর কোনও থেরাপি প্রয়োগ করি নি, কারোর সাথে কোনও কাউন্সিলিং সেশনও নিই নি। আমি স্টাফদের সাথেও কোনোরকম কনফারেন্স করি নি। আমি শুধু নিজের মধ্যে ১০০% ‘হো’ওপনোপনো’ প্র্যাকটিস করে গেছি। (সুত্রঃ জিরো লিমিট, ১৪২নং পৃষ্ঠা)
জো ভীটালের সাথে একটা সাক্ষাৎকারে ডঃ হিউ বলেন – ‘আমি অন্য কাউকে হীল করি নি, আমি নিজের মধ্যেকার কিছু অংশকে হীল করেছি, যার প্রতিফলন আপনারা দেখছেন’!
কি সাংঘাতিক ব্যাপার বলুন তো!! ভাবা যায়? নিজের ভেতরের পরিবর্তন এনে, বাইরে এত বিশাল একটা পরিবর্তন ঘটানো যায় কি!! বিশ্বাস করুন, আমি নিজে প্রথম যখন ‘হো’ওপনোপনো’র কথা জানতে পারি, কিরকম অদ্ভুত লাগছিল। এইরকম হয় বুঝি!! বিজ্ঞানের ছাত্রী, পরখ না করে তো মানতে রাজি নই। তবে বয়স যত বাড়ছে, একটা কথা খুব স্পষ্ট হচ্ছে –‘কিছু না মানার আগে, আগে জানতে হয়’। পড়াশোনা শুরু করলাম, তারপর পরখ করা শুরু হল। এসব কথা পরে একদিন বলব, এখন ‘হো’ওপনোপনো’টা কি, সেটা বলি।
‘হো’ওপনোপনো’ আসলে একটি প্রাচীন মন্ত্র, যার দ্বারা আত্ম-পরিশোধন করা হয়। এই মন্ত্র উচ্চারণের কিছু শর্ত আছে।
১। সবসময় মনে রাখতে হবে, আমার জীবনে যা ঘটছে, যা ঘটেছে বা যা ঘটবে তার ১০০% দায় বা দায়িত্ব আমার।আমার খারাপ লাগা, আমার ভালো লাগা, আমার রাগ, আমার অভিমান, আমার হাসি, আমার বিষাদ, আমার দুঃখ, আমার হতাশা, আমার আনন্দ, আমার উল্লাস, আমার ঘৃণা, আমার পরিতাপ, আমার সন্দেহ, আমার অনুশোচনা, আমার সুখ, আমার শান্তি – সবকিছু আমার হাতে।
২। এইটা মানে শুধু নিজেরটুকু দেখলেই হবে না, বড় পরিধিতেতে ভাবতে হবে নিজের পরিবার, চারপাশের পরিবেশ, নিজের পাড়া, নিজের দেশ, সারা বিশ্বের কথা – সেই অনেকটা জলের মধ্যে পাথর ফেললে যেমন রিপল এফেক্ট হয়, সেই রকম।
৩। বারংবার মনে রাখতে হবে, আমার মধ্যে অসীম ক্ষমতা আছে, এই ক্ষমতা সৃষ্ট করে, ধ্বংস করে না।
৪। নিজশক্তির সফল চেতনাই অসম্ভকে সম্ভব করায়।
এই ‘হো’ওপনোপনো’ শুধু চারটে বাক্য দিয়ে তৈরি। বাক্যগুলি উচ্চারণের সময় মন শান্ত করে, আলগা হাসি মুখে লাগিয়ে, প্রকৃত অনুভূতির সাথে উচ্চারণ করতে হয়।
(ক) আই লাভ ইউ।
(খ) প্লিস ফরগিভ মি।
(গ) আই অ্যাম সরি ।
(ঘ) থ্যাঙ্ক ইউ।
(ক) আই লাভ ইউ।
নিজেকে বলতে হবে –“আমি তোমায় ভালোবাসি’। আমাদের এই পোড়া দেশে ছোটবেলা থেকে কতকিছু শেখানো হয়, অথচ নিজেকে ভালবাসাতে হয়, এই শেখাটাই বাদ পরে যায়। বড় বেশি করে বলা হয় –‘লোকে কি বলবে, লোকে কি ভাববে, এমন করতে নেই, এমন বলতে নেই....’ নিজেকে ভালো না বাসলে কি অন্য কাউকে ভালোবাসা যায়? স্বার্থপরতার কথা বলছি না। নিজেকে ভালোবাসা মানে, নিজের আচরন-উচ্চারন-মনন কে শুদ্ধ রাখা। আমার এক বন্ধু একবার বলেছিল –‘জানিস আমি স্মোক করি না, ড্রিঙ্কও করিনা; নিজের ক্ষতি হোক, এমন কিছু করি না’। যদি সম্ভব হয়, কখনো একটা কথা ভেবে দেখবেন – আপনি সারাদিন যা ভাবেন, যা বলেন, যা করেন, সেগুলো যদি কোনও অলীক শক্তিবলে আপনার চামড়ায় ফুটে ওঠে, কেমন লাগবে? এ জন্যই “আই লাভ ইউ” বলা কত্ত উপকারী ভাবুন তো!
(খ) প্লিস ফরগিভ মি।
আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটে, কোনও বিশেষ কারণের জন্যই ঘটে, তাই প্রতিটা ঘটনার দুটো দিক থাকেই।আকবর আর বীরবলের একটা গল্প আমরা সবাই পরেছি ছোটবেলায়। আকবর একদিন বীরবলকে নিয়ে শিকারে গেছেন। তীর মারতে গিয়ে আকবরের একটা আঙ্গুল কেটে যায়। সকলে ব্যস্ত হয়ে পরে বাদশার শুশ্রূষায়। বীরবল এসে বলে-‘জাঁহাপনা, এই আঙ্গুল কাটার নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে, যা হয় ভালোর জন্যই হয়’; ব্যস, আর যায় কোথায়! বাদশা রেগে আগুন, তক্ষুনি আদেশ দেওয়া হল বীরবলকে কারাগারে পোরার।এরপর কিছুদুর যেতে যেতেই আকবরকে স্থানীয় আদিবাসিরা পাকড়াও করে বলির জন্য নিয়ে যায়, বলিকাঠে দেবার সময় তারা লক্ষ্য করে আকবরের কাটা আঙ্গুল। অসম্পূর্ণ দেহের বলি হয় না, তাই তারা আকবরকে ছেড়ে দেয়। আকবর দৌড়ে আসে বীরবলের কাছে, ক্ষমা চায়, বলেন – তিনি আজ বুঝেছেন যে যা হয় সবকিছু ভালোর জন্যই হয়।বীরবলও উত্তর দেয়, আমি তো জানি, তাই জন্যই দেখুন আমি আপনার সাথে ছিলাম না। নতুবা , আপনাকে বাদ দিয়ে আমাকেই যূপকাষ্ঠে নিয়ে যেত। আমি আপনাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি আমার জবন বাঁচানোর জন্য। থ্রি ঈডিয়েটস ছবিটা মনে আছে? সেই ‘আল ইস ওয়েল’ ফর্মুলা। নিজে কিছু ভেবে কষ্ট পাচ্ছি – নিজেকে খারাপ লাগাচ্ছে তো আমার নিজেরই কিছু ভাবনা। ভাবার ধরন বদল করলেই জীবনধারণ বদলে যায় (কগনেটিভ এ্যাপ্রোচ)। তাই তো, নিজেকে খারাপ লাগাব না, তাই ‘প্লিস ফরগিভ মি’ , নিজের কাছে ক্ষমা চাওয়া। নিজের ভুলটা স্বীকার করা। জৈনরা বলে ‘মিছাম্মি দুক্কাদম’ – সেই এক প্র্যাকটিস ; প্লিস ফরগিভ মি।
(গ) আই অ্যাম সরি।
নিজের কাছে নিজের স্বীকারোক্তি, আই অ্যাম সরি। ভুল একবার হয়, বারবার হলে, সেটা অন্যায়। নিজের কাছে ‘ভুল স্বীকার’এ তো লজ্জা নেই। বরং, চরিত্রের দৃঢ়তা প্রকাশিত হয়। কারেক্টিভ আর প্রিভেন্টীভ মেসারের মতন তো ভাবাই যেতে পারে।
কবি বলে গেছেন –
‘প্রান চায়, চক্ষু না চায়, মরি এ কি তোর দুস্তর লজ্জা
সুন্দর এসে ফিরে যায়, তবে কার লাগি মিথ্যা এ সজ্জা”।
বড় গভীর এ বানী। আমরা নিজের কাছেই নিজেরা পরিস্কার নই – যাকে বলে ‘ভাবের ঘরে চুরি’।
আমি ব্যক্তিগত ভাবে সকলকে পরামর্শ দিই, যখন মনে হবে সবাই আপনার বিরুদ্ধে, অন্যদের জন্য আপনার জীবন নরকে পরিণত হয়েছে, তখন একটি বার, ঘরের দরজা বন্ধ করে, আয়নার সামনে সম্পূর্ণ নিরাভরণে নিজেকে দেখুন। দেখবেন, নিজের দিকে চাইতেই আমাদের লজ্জা লাগে, আমরা কতদিন দেখি নি যে আমারদের শরীরের কোথায় কোথায় ময়লা জমে আছে।” সেগুলো যেদিন সত্যি সত্যি পরিস্কার করা যায়, দেখা যায় নিজের এনার্জি নিজের যত্নেই ব্যবহার হচ্ছে, অন্যের শোধনের জন্য নয়।
(ঘ) থ্যাঙ্ক ইউ।
সব শেষে, থ্যাঙ্ক ইউ। প্রাপ্তি স্বীকার। পারলাম আমি।পারলাম নিজেকে ক্ষমা করতে, পারলাম নিজেকে ভালবাসতে। ভেবে দেখলাম কতকিছু পেয়েছি আমি।
কবির কথায় –
‘না চাহিতে মোরে যা করেছ দান,
আকাশ, আলোক, তনু মন প্রান
দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায় সে মহাদানেরই যোগ্য করে
অতি ইচ্ছার সঙ্কট হতে বাঁচায়ে মোরে...
আমি বহু বাসনাই প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে’
কতকিছু নিয়ে আমাদের অভিযোগ প্রতিনিয়তঃ। এটা নেই, ওটা নেই, এ কেন এরকম, ও কেন ওরকম, এইটা ঠিক, ওইটা ভুল..... সমস্যা তৈরি হয়, সমস্যা মনে হয় তখনই – যখন আমরা আমাদের ‘কি আছে’ তা ভুলে গিয়ে ‘কি নেই’ তার দিকে বেশি ফোকাস করি। এবং সব সময় আমরা এটাই করি। আমরা ভুলে যাই, আমাদের তো হাত-পা আছে, অনেকের নেই, আমাদের পরার জামা আছে, খিদে পেলে খাবার আছে, চোখ আছে, কান আছে, নাক আছে, প্রিয়জন আছে, বিছানা-বালিশ আছে, কল খুললে জল আছে, পকেটে পয়সা আছে..... আমরা শ্বাস নিতে পারছি, এই সময় আপনারা যখন লেখাটা পড়ছেন, অনেকেই ‘বডি’ হয়ে শ্মশানে শুয়ে আছে, শেষযাত্রার পথে...... এগুলো কি প্রাপ্তি নয়? এগুলো কি ভাবা যায় না? এগুলো ভাবলে নিজেকে ঋদ্ধ লাগে না?
এইবার কি ‘লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট’ – এর আসল মানে বোঝা যাচ্ছে?একটু হলেও, মানতে কি পারা যাচ্ছে যে ভালো থাকা কতটা সহজ?
শুভেচ্ছা রইল। ভালো ভাবুন ! বাকিগুলো এমনিতেই হয়ে যাবে।
কথা বলতে চাইলে যোগাযোগ করবেন। লেখা পড়ে ভালো লাগলে, কাজে লাগলে, জানাবেন।
জয়তি মুখোপাধ্যায়
লাইফ-এন্থুসিয়াস্ট

Khub valo.. Mon bhalo hoye galo
ReplyDelete