Skip to main content

চাইলেই হবে, তাই চাইতে হবে #২


আচ্ছা, ধরুন, আপনি বহুদিন ধরে কিছু একটা করবেন বলে ভাবছেন ….. ধরুন না, আপনি কোন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং আপনি যথেষ্ট কনফিডেন্ট যে, আপনি প্রথম হবেন বা আপনার মতন প্রস্তুতি কারোর নেই। কিন্তু, ঘটনাক্রমে দেখা গেল, সেই পরীক্ষাটাই ক্যান্সেল হয়ে গেছে; তখন আপনার মনের অবস্থা কেমন হবে মনে হয়…..? অথবা, আপনি একটা নতুন মোবাইল ফোন কিনবেন বলে অনেক দিন ধরে একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছেন। ঠিক করেছেন, এই দুদিন পরেই ফোনটা কিনে ফেলবেন। মনটা বেশ উৎফুল্ল। অনেকদিনের ইচ্ছাপূরন হতে চলেছে। কিন্তু……. এর মাঝে হঠাৎকরে সব জমানো টাকা চুরি হয়ে গেল। বলুন তো, কেমন লাগবে? ভাবুন একবার শুধু।নতুবা ধরুন না, আপনি খুব যত্ন করে কোন খাবার বানিয়েছেন, বাড়ীতে অতিথি আসবে, তাদের জন্য। কিন্তু পরিবেশন করতে গিয়ে…পুরোটাই হাত থেকে পড়ে গেল…. তখন? কেমন লাগবে?আজ যে গল্পটা বলতে চলেছি…. সেইটা এইসব পরিস্থিতির মানসিক অবস্থাকে এক সজোরে আঘাত হানতে চলেছে।
আজ আপনাদের এক বাঘের বাচ্চার গল্প শোনাব।
সময়টা ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দ, হাঙ্গারীর আর্মিতে “ক্যারলি ট্যাক্স” কে বিশ্বখ্যাত পিস্তল শ্যুটার আখ্যা দেওয়া হল।
এখন, কে এই “ক্যারলি”?
১৯১০ সালে ২১শে জানুয়ারি বুদাপেস্ট এ জন্ম হয় ক্যারলির। খুব অল্প বয়সেই সে হাঙ্গারীর আর্মি পিস্তলটীম এর সদস্য হয়ে পিস্তল চালনায় দক্ষ হয়ে ওঠে। নিজের ডানহাতটা নিয়ে ভারি গর্ব ছিল তার। নিজে সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল – “This is my right hand and I will make this hand the best shooting hand in the world”.
বহু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীতায় জয়লাভ এর পরেই তাকে বিশ্বখ্যাত পিস্তল শ্যুটারের আখ্যা দেওয়া হয়।
সে আর্মি কমিশনড অফিসার পদধারী ছিল না বলে, ১৯৩৬ সালের সামার অলিম্পিকের সময় হাঙ্গারীর শ্যুটিং দলে সার্জেন্ট ক্যারলির স্থান হয় না।বার্লিন বিভাজনের সময় এই নিয়ম বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ক্যারলি খুব কাছেই ছিল ১৯৪০ সালের টোকিও অলিম্পিকে স্বর্ণপদক লাভের। সকলেই জানত, ক্যারলি ছাড়া পিস্তল শ্যুটিংএ আর কেউই সোনা পেতে পারবে না; কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় এক;
১৯৩৮ সালে, একদিন একটা আর্মি ট্রেনিং সেশনে ক্যারলির ডানহাতে হ্যান্ডগ্রেনেড ফেটে যায় সাথে তার স্বপ্নপুরনের যবনিকা পতন হয় – হ্যাঁ, আপনি এটাই ভাবছেন তো? ডান হাত ছাড়া বন্দুক চালাবে কেমন করে, তাই না ?
ঠিকই তো, সে তো ভাবতেই পারতো, কেন তার সাথেই বিধাতা এমন আচরণ করলেন? সারা বিশ্বের মধ্যে তার সাথেই এমন কেন হল? আমরাও তো তাইই ভাবতাম আর কপাল চাপড়াতাম; তাই তো?
কিন্তু, ক্যারলি ছিল একজন সাচ্চা বাঘের বাচ্চা। সে কি করল জানেন? আচ্ছা, আপনারা সেই ব্যাঙ-এর গল্পটা শুনেছেন? যেখানে ব্যাঙদের মধ্যে ঠিক হয়, একটা লম্বা বাঁশে যে ব্যাঙ উঠতে পারবে, সেই হবে ব্যাঙের রাজা। সব ব্যাঙ চড়তে শুরু করল, আর চারদিক দিয়ে শুরু হল বলা – ওরে, পড়ে যাবি, অনেক উঠে গেছিস, আর পারবি না, নেমে আয়…. ইত্যাদি। ধপ ধপ করে ব্যাঙেরা পড়তে লাগলো, শেষে দেখা গেল, যে ব্যাঙটা সবচেয়ে উপরে উঠেছিল, মানে যে ব্যাঙটা জিতল, সে শুনতে পেত না…
ঘটনাটির পর ক্যারলিকে খুঁজে পাওয়া গেল না। সব্বাই মনে করল, মনের দুঃখে ক্যারলি কোথাও চলে গেছে;
ক্যারলি, সেই বাঘের বাচ্চার ছিল স্টিলের মতন স্নায়ু। সে মানুষের সহানুভূতি পেতে চায় নি, সে চেয়েছিল নিজের স্বপ্নপুরন করতে।
একমাস হাসপাতালে থাকার পর সে নিজে এক গুপ্ত জায়গায় চলে যায়, এখনো সে বেঁচে আছে, এখনো তার কাছে তার বাঁ হাত আছে, সে তার বাঁ হাতটাকেই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী বানাতে বদ্ধপরিকর, অলিম্পিকে সোনা তাকে জিততেই হবে যে। He had the will, he had the attitude, he had the determination to succeed, এবং সে নিজেকে একজন সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ হিসেবে ভাবতে শুরু করল, এবং নিজের বাঁ হাতটাকে শ্যুটিংএর জন্য তৈরি করতে লাগলো। তার ব্যাথা করত, কিন্তু সে তার সমস্ত অক্ষমতাকে, বেদনাকে চালনা করেছিল নিজের লক্ষ্যপুরনের দিকে। সমাজের থেকে আলাদা করেছিল নিজেকে, যাতে কোনোরকমের নেতিবাচক উক্তির বা পরিস্থিতির সম্মুখীন না হতে হয়। নিজের চোখের সামনে নিজের স্বপ্নকে রোজ সে স্পষ্ট দেখতে পেত। অসম্ভব অনমনীয় দৃঢ় মনোবল তার বাঁ হাতকে ধীরে ধীরে যোগ্য করে তুলছিল। এইবার সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল তার বাঁ হাতকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শ্যুটিংহ্যান্ড প্রতিপন্ন করতে।
১৯৩৯ সাল, হাঙ্গারীতে জাতীয় শ্যুটিং প্রতিযোগিতার আসরে ক্যারলির আবির্ভাব হল। সকল প্রতিযোগীরা বেজায় খুশি, সবার কাছেই ক্যারলি একজন আদর্শ, তাদের বিশেষ দিনে ক্যারলির উপস্থিতি নিশ্চিতরূপে অনুপ্রেরণার যোগান দেবে। সবাইকে চমকে দিয়ে ক্যারলি বলে, সে কাউকে অনুপ্রাণিত করতে আসে নি, সে এসেছে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। সেই বছর সেই চ্যাম্পিয়নশিপ কে জেতে সেটা আর এখন আলাদা করে বলতে হবে না নিশ্চই। আজ্ঞে হ্যাঁ, সারাদেশের সকল মানুষকে দেখিয়ে দেয় ক্যারলি,  প্রতিবন্ধকতা শরীরে থাকে না, মনে থাকে; হাতে তার ধরা ছিল সোনার পদক।
এর পর, পর পর দু বার ১৯৪০ সালের টোকিও অলিম্পিক এবং তার পরে ১৯৪৪ সালের অলিম্পক বাতিল হয়ে যায়, কারণ ছিল বিশ্বযুদ্ধ। ক্যারলির বয়স বাড়ে সাথে সাথে মনোবলও। ক্যারলির অনুশীলন থামে না।
১৯৪৮ সাল, লন্ডন অলিম্পিক, সারা বিশ্বকে চমকে দিয়ে, পিস্তল চালনায় সোনা লাভ করে এক হাতের ক্যারলি। এখানে সে থেমে থাকে নি….
১৯৫২ সালের হেলসিঙ্ক অলিম্পিকেও সে সেকেন্ড গোল্ডমেডেল লাভ করে।
একবার ভাবুন, আমরা সবসময়, যা আমাদের নেই, যা হারিয়ে গেছে, সেই নিয়েই দুঃখ করি, পড়ে পড়ে কাঁদি, কিন্তু যেটা আছে, সেটা নিয়ে যে ভালো থাকা যায়, সেটাই ভুলে যাই।
কিছু মন থেকে চাইলে, সেটা পাওয়া সম্ভব। উপায়টাও, সুযোগ হিসেবে পেতে পারা যায় সেই ইচ্ছাশক্তির জোরেই।আর এই ইচ্ছাশক্তিই অসম্ভবকে  সম্ভব করিয়ে দেয়।
হ্যান্ডগ্রেনেড ক্যারলির ডানহাতকে কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু অলিম্পিকে সোনা যেতার ইচ্ছেকে কেড়ে নিতে পারে নি।
তা হলে, আবার প্রমানিত “চাইলেই হবে, তাই চাইতে হবে”
জয় ইচ্ছাশক্তির জয়!!

Comments

Popular posts from this blog

‘হো’ওপনোপনো’

কথায় আছে লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো? ক্ষমা কি করা যায়, যদিও বা যায়... সেটা কি ভোলা সম্ভব? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় একটা বড় ভুমিকা নেয়, দিন যেতে যেতে ঘটনার অনুভুতির তীক্ষতা কমতে থাকে, আমরা মনে করি ‘ভুলে গেছি’; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য অনুরূপ কিছু হলে বা মনে পড়লেই দগদগে ভাব নির্লজ্জের মতন বেরিয়ে পরে।  হ্যাঁ, আমিও বলছি, ভালো থাকতে গেলে এই –“ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট” যাদুর মতন কাজ করে। একটা সত্যি ঘটনা বলি আজকে, আমার জীবনের। আমার বাড়ির পাশেই একটা কোচিং সেন্টারে আমার ছেলে পড়ত। ঘটনাক্রমে, সেন্টারহেডের ছেলেও আমার ছেলেরই ক্লাসের বন্ধু। প্রচলিত আছে, সেই সেন্টারহেড (নাম ধরে নিই ‘ক’বাবু) ভালো ছাত্রছাত্রী ছাড়া সেই সেন্টারে পড়ান না। তাই, আমার ছেলে যখন ক্লাস সেভেন (ছেলে আমার বরাবরই ৬০% পাওয়া – ছোটবেলায় লারনিং ডিসঅর্ডার ছিল) তখন তিনি তাকে যোগ্য মনে করেন নি সেই সেন্টারের। ক্লাস নাইনের সময়, আমি দেখলাম, ওর ক্লাসের অনেকজন ওই সেন্টারেই পড়ে আর বাড়ির পাশে বলে, আমারও সুবিধে হবে, অনেকগুলো পথ খরচ বেঁচে যাবে... এইসব ভেবে আবার গেলাম ‘ক’ বাবুর কাছে, অনুরোধ করলাম আমার ছেলেকে ভর্তির জন্য; বদলে ...

শিক্ষা

  একবার হয়েছে কি, ভীষণ উত্তেজনাবশতঃ বেশ কড়া দামে টিকিট কেটে দেখতে গিয়েছিলাম একটা সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। তারপর…. একঘণ্টা যেতে না যেতেই প্রান হাঁসফাঁস, হাত কামড়ানো। মনে যুদ্ধ চলছে – ‘এত খাজা ছবি কি করে হতে পারে’র সাথে ‘ঈশ, কত খরচ হয়ে গেল’র। ভাবতে ভাবতে, পকেট আরও খসিয়ে পপকর্ণ আর কোল্ড্রিঙ্কও খাওয়া হয়ে গেল। হল থেকে বেড়িয়ে কান মুলেছিলাম, এমন বোকামি আর হবে না, শপথ টপথও নিয়েছিলাম খানিক। বলুন তো, আসল বোকামিটা কোনটা ছিল? দামী টিকিট কেটে বাজে সিনেমা দেখা না কি সিনেমাটা বাজে বুঝেও, বেশি খরচ হয়ে গেছে এই ভেবে, হলে বসে নিজের সময় বরবাদ করে পুরো সিনেমাটা হজম করা? নিজেদের জীবনের দিকে একবার ভালো করে তাকাই তো; আমাদের সম্পর্কগুলোও অনেকটা এইরকম নয় কি? কাজ করছে না জেনেও, লেগে থাকি, সম্পর্কের ভার বয়ে চলি অনেক ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গেছে, লোকে কি বলবে… এইসব ভেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে যে সবচেয়ে দামী ইনভেস্টমেন্টটা পাঁকে চলে যাচ্ছে…মানে “সময়”…যেটা আর ফিরে আসবে না, তার কথা ভাবা হয়ে ওঠে না।   কিছুই কিন্তু অপূরণীয় নয়। আপনি না থাকলে, বা আমি না থাকলে সব কি থমকে যাবে? কিছুদিন আগে ইন্সটাগ্রামে একটা পোস্ট দেখে...

নিশিদিন আলোক শিখা জ্বলুক প্রাণে

  জীবনের সবকিছু আমাদের শেখায়। যাদের সাথে দেখা হয়, যাদের সাথে থাকা হয়, যাদের কথা ভাবা হয়, যা যা ঘটে  … সবার থেকে কিছু না কিছু শিখতে পারা যায়। বা, বলা ভালো- শিখতে পারতে হয়, শিখতে জানতে হয়। কারণ, শিখতে পারলে এইসবই আমাদের কাছে “অভিজ্ঞতা” যা জীবন চলতে সাহায্য করে। নতুবা, এগুলোই আমাদের যাবতীয় অ-সুখের কারণ।    তাই, আমাদের প্রতিটা মুহূর্তের ঘটে যাওয়া, ঘটতে থাকা ঘটনাগুলো, ঘটনার কুশীলব সকলেই আমাদের শিক্ষক।   এইসব শিক্ষকদের অবহেলা করবেন না। যখন আপনি মনের মতন চাকরি পাচ্ছেন না, বা যখন কোনও সম্পর্ক প্রশ্নচিহ্নের সামনে, অথবা যখন আপনার বিরুদ্ধে সব ঘটছে, আপনি সমস্যার সম্মুখীন, সেই মুহূর্তে এই শেখার পাঠ আরও বেশি করে মনে করুন। কবি তো বলেই গেছেন কতভাবে – “আরও বেদনা, আরও বেদনা, প্রভু দাও মোরে আরও চেতনা”… “চির পিপাসিত বাসনা-বেদনা, বাঁচাও তাহারে মারিয়া…” “আমি বহু বাসনাই প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে”….. গানগুলো শোনা হয়, গাওয়া হয়, কিন্তু অর্থটাই বোধগম্য হতে পারে না। সমস্যার সময়ে নিজের জীবনের শিক্ষাগুলোকে মনে করে ফেলতে পারলেই কিন্তু সেই পরীক্ষাটা সহজে পাশ করা হয়ে যাবে। যে সব অবস...