ভারি সুন্দর নাম আমার মায়ের ‘চন্দ্রলেখা’।ছোটবেলা থেকে একটা বেশ গর্বের ব্যাপার ছিল যে আমার মা অফিসে চাকরি করে।
সেই মনে আছে, আমার মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় দু পায়ে দু রকম চটি পড়ে চললেন তিনি, খেয়ালই নেই ... আলমারির চাবি ভুল করে ফ্রিজের মধ্যে রেখে, চাবির জন্য সারা বাড়ি হুলুস্থুল! কমলালেবুর খোসা বাঁ হাতে আর ডান হাতে পাকানো ১০০ টাকা, খোসা থাকল হাতে, টাকা চলে গেল জানলার বাইরে...বাবা কে ওষুধ দিতে গিয়ে হাতের জলের বোতলে ঢোঁক দিয়ে মনে হওয়া –এম্মা আমিই যে ওষুধ টা খেয়ে ফেললাম!!
কতদিন, কত রকম ভাবে labeled হয়েছে, কত জনের কত রকমের judgmentএর শিকার হয়েছে, কত রকমের কত কিছু... আমিও বাদ যাই নি।
মা কিন্তু, নিন্দা করে না, মা কে কোনও সময় সমালোচনা করতে দেখি নি, আলোচনা করেছে। আঘাত পেয়েছে, কিন্তু যার কাছ থেকে পেয়েছে, তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ে নি। খুব অভাবের দিনেও আমাদের বাড়ীতে যে এসেছে, না খেয়ে ফেরেনি।
মা শিখিয়েছে আমায়, পার্থিব জিনিষের উপর লোভ করতে নেই, মা শিখিয়েছে , সবার থেকে শুধু ভালোটুকু নিতে। “Forgive & Forget” -ভালো থাকার অমোঘ মন্ত্র; মা নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়েছে আমায়।
কোনোদিন বুঝতে দেয় নি নিজের ভেতরকার উথাল পাথাল অবস্থা।
ভারি রাগ হতো মায়ের উপর, কোনও সমস্যার কথা, কষ্টের কথা বললেই বলতে থাকে, আমার কষ্ট পাওয়া উচিৎ নয়, ঘটনা কে অন্য ভাবেও দেখা যায়.... তখন বুঝতে পারি নি, কি সাংঘাতিক জীবনবোধ এর অনুশীলন চলছে আমার।
বাবা চলে যাবার পর ভেবেছিলাম, কিছু সম্পর্ক থেকে নিজেকে একেবারে বিযুক্ত করব, মা হতে দেয় নি। রাতের পর রাত আমায় বুঝিয়েছে, একটা ঘটনা দিয়ে রক্তের সম্পর্ককে নষ্ট করা যায় না। সবাই বাবার আপনজন, বাবাকে ভালবাসলে, বাবার কাছের জনদেরও ভালবাসতে হবে। আছে, আজ সবার সাথে আমার বেশ ভালো সম্মানীয় সম্পর্ক। মার থেকে জেনেছি, কেউ যদি আমার উপর অভিযোগ করে, সেটা আসলে অভিমান, আসলে আমায় ভালবাসে বলেই তো এক্সপেক্ট করে কিছু ....
মা কে বুঝতাম না, অসম্ভব একটা রাগ ছিল ... কিন্তু বাবা চলে যাবার পর, মা এর সাথে আমার একটা নতুন কেমিস্ট্রি শুরু হয়েছে, মা এখন আমার বিশেষ বন্ধু। সকাল বেলা চা খেতে খেতে খাবার টেবিলে বসে আমি আমার এই বিশেষ বন্ধুর সাথে সময় কাটাই...খুব দামি মুহূর্ত এগুলো।
মায়ের সাথে থাকি...আমার মা কে প্রয়োজন, মায়েরও আমাকে; এক কথায় আমাদের এটা একটা সিমবায়োটিক রিলেশনশিপ;
খুব ছোটবেলায় বাবা কে হারিয়েছে আমার মা, বয়স বাড়িয়ে চাকরিতে ঢুকেছে, খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গিয়েছিল সে।
আজ মায়ের জন্মদিন, ৬৫ পার করল ... আজ থেকে মা আমার বড়মেয়ে।
এখুনি একটা পোস্ট দেখলাম ফেসবুকেঃ “It doesn’t matter what is in front of her…because of what is behind her”. লেখার সাথে ছবিতে আছে একটা সিংহছানা তার পেছনে বৃহদাকার সিংহি।
হ্যাঁ, আমিও ভয় পাই না, জানি তো, কে আছে আমার পেছনে – An Iron strong lady!!

Comments
Post a Comment