Skip to main content

28th April, 2018

 


আজ আবার এক ২৮শে এপ্রিল , ৬ বছর হয়ে গেল .........

বাবা অফিস যেত ৫নং বা ১নং ট্রামে চড়ে, আমি আমাদের ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতাম, বাবাকে দেখতাম ট্রামে চড়া অব্দি। এরকম বহুদিন হয়েছে, টা টা করতে গিয়ে বাবাকে বলেছি, ‘তুমি অফিস যেও না’, আর বাবা ট্রামে না চড়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমায় গল্পের বই থেকে গল্প শুনিয়েছে। বাবার হাতে শোয়া, বাবাকে জড়িয়ে শোয়া – বাবার আমার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দেওয়া, শিস দিতে দিতে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া, পা টিপে দেওয়া, আঙ্গুল টেনে দেওয়া....... এখন আবার সেই ছোট্ট হয়ে যেতে ইচ্ছে করে।টাইম মেশিন কি সত্যি বানানো যায় না?
শ্যামবাজার বাড়ির ছাদে ঘুড়ি ওড়ান হত, বাবা, কাকুম, কাকা সব্বাই মিলে ওড়াত। সামনের বাড়ি, পাশের বাড়ি থেকে সব্বাই ওড়াত, কি মজা হত।আকাশ ভর্তি ঘুড়ি, নিজেদের ঘুড়িগুলো মাঝে মাঝেই নজরের বাইরে চলে যেত, বাবা দেখাত – ‘ওই তো, দ্যাখ’; দেখতে না পেলেও হ্যাঁ বলেছি; কারন বাবা বলেছে।
ঝাড়গ্রামের সেবায়তন হস্টেলে বাবার দস্যিপনার গল্প শুনতাম দুপুর বেলায়, ঠাম্মার পাশে শুয়ে। রোজ রোজ প্রায় একই গল্প। কাকুম বলেছিল, বাবাকে কি ভাবে সিগারেট ধরিয়েছিল। আর কাকা তো নিজেই একজন ভারি মজার মানুষ, ভীষণ মজা করে বাবা-মায়ের প্রেমপর্ব গল্প করে বলে, এখনও।
তখন আমরা শ্যামবাজার থেকে সল্টলেকে চলে এসেছি; একদিন শ্যামবাজার থেকে ফেরার পথে ২০১ বাসে উঠেছি বাবার সাথে। তখন এই ক্লাস ফাইভে পড়ি বোধহয়। বাবা পিছনের দিকের সিটে বসল আর আমি সামনে ড্রাইভারের পেছনের লম্বা সিটে জানলার ধারে। বাসটা উল্টোডাঙার কাছাকাছি আসতেই বাবা দেখি আমার কাছে এসে দাঁড়াল, বাসে তখন বেশ ভিড়। “কি রে বুড়ি, তোর শরীর খারাপ লাগছে?”, আমি উত্তর দিই, “না, বাবা”। পরের প্রশ্নটা মারাত্মক – “চুপ করে আছিস কেন? পটি পেয়েছে?” ক্লাস ফাইভ হলে কি হবে, নিজের কি সম্মান বোধ নেই? একে বাসের মধ্যে ‘বুড়ি’ বলে ডাকা।।তারপর এই প্রশ্ন! নিজেকে মনে হচ্ছিল বাসের জানলা থেকে ঝাঁপ মারি, ঈশশশ.... আমি বড় বড় চোখ করে তাকাই, বুঝেছিলাম, মুখে বলে লাভ নেই। কিন্তু লোকটাকে থামায় কে, এরপর আসে আস্বাশ বাক্য – “সামনেই তুতুনদের বাড়ি, চল নেমে যাই,” ..... আমি জানলা থেকে মুখ ফেরাই নি, ৫নং ট্যাঙ্ক স্টপ আসলে একসাথে নেমেছিলাম; মনে আছে খুব রেগে ছিলাম অনেক দিন।
একবার, আমি, মা, বাবা শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলাম। সামনে এসক্যালেটর; আমি এগিয়ে গেছি উৎসাহে, মা-বাবা পেছনে। মা বলছে – ‘বাবুন, সাবধানে’। আমি এসক্যালেটরে পা দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মা-বাবা চলে এসেছে কাছেই,. হঠাৎ শুনলাম বাবার গলা – আরে, আরে, বউদি পড়ে গেছে। আমি ততক্ষণে উপরে উঠে গেছি। দেখি, মা চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে আর বাবা টেনে তুলছে। চারপাশে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। স্টেশন থেকে বেড়িয়ে আমি মায়ের হাত ধরে হাঁটছিলাম, বাবা দূরে দূরে। বাবার কথা ছিল – তোর মা কি ভাবে এত আনাড়ি হতে পারে.... এই ভেবে পরিচয়ই দেয় নি। মা ব্যাথা নিয়ে শুধু হেসে যাচ্ছিল।
সল্টলেকে তখন খুব লোডশেডিং হত আর আমরা সবাই মিলে গানের লড়াই খেলতে বসতাম।বাবা সব পুরনো হিন্দি গানগুলো ভুলভাল ভাবে শুরু করত, কিছু তখন জানতাম না তো – মা মৃদু আপত্তি দেখালেও সেটা খাটত না। আর লাইট এলেই বলতো, ‘আমার সাথে খেলতে আসিস না, হেরে ভুত হয়ে যাবি’।
খুব ভালো লাগত, বাবা- মা র ক্যারম কম্পিটিশন দেখতে, মা ছিল ব্যাঙ্কের ক্যারম চ্যাম্পিয়ন। বাবার সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হত। পরে যখন আমি, মালিনী, বুয়া বাবার সাথে তাস খেলতাম, সেই রকম উত্তেজনা হত।
বাবা ছিল আমার ডার্লিং, আমার প্রথম কফি হাউস যাওয়াও বাবার হাত ধরেই।
বাড়িতে প্রথম ফোন এসেছে। সাইকেল করে লোকজন এসেছে লাইন লাগাতে। এই সময় দেখা গেল, একজনের সাইকেল চুরি হয়ে গেছে। বাবা কি করল জানো, লোকটাকে ডেকে পাঁচশ টাকা (তখন ১৯৯৫ সাল – টাকার অঙ্কটা খুব একটা কম নয়) দিয়ে দিল , বলল – আমার বাড়ি সামনে থেকে চুরি হয়েছে, আমার তো দায়িত্ব রয়েই যায়।
বাবাকে আদর করে ডাকতাম – ‘হৈ হৈ বাবু’। যেমন খুব রাগারাগি করত, তেমনি জমিয়ে দিত আসর। আমরা বাবার সাথে খুব একটা বেড়াতে যাই নি, বাবা চাইত বাড়িতে সবাই মিলে হৈ হুল্লোড় করুক। আমার বাড়িতে সব সময় তাই জমজমাট থাকত।
সেই সময় বাংলাদেশের সিরিয়াল হত- ‘ম্যানিম্যাল’, ‘জনি সোকো অ্যান্ড হিজ ফ্লাইং রোবোট’, বাবার সাথে বসে বসে দেখতাম। আমার বন্ধুদের মধ্যে আমার বাড়িতেই কেবল টিভি প্রথম এল, খুব টিভি দেখতাম (তবে রাত ন’টার পর নয়)। একটা সিরিয়াল হত- ‘বনেগি আপনি বাত’, বুধবার করে হত। মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে বাবা আমায় নিজে ডেকে সিরিয়াল দেখিয়েছে, মা চেঁচিয়েছে।
প্রচণ্ড ভীতু ছিল মানুষটা। চোখের অপারেশান করাবে কিন্তু শর্ত ছিল ফুল অ্যানাস্থেসিয়া করতে হবে। কলকাতায় তো কোথাও এরম হবে না, তাই মালদায় চলে গেল। পেছনে রিবন দেওয়া ড্রেস পরে অপারেশন টেবিল থেকে উঠে বেড়িয়ে এসেছিল, যখন শুনেছিল ওখানেও সত্যি করে ফুল অ্যানাস্থেসিয়া হবে না।
বাবাকে সব কথা না বললে হজম হত না। মা খুব রাগ করত, তাও বলতাম। মা বরাবরই একটু উচিৎ কথা বলার মানুষ উল্টোদিকে বাবার কাছে আমি সবসময় ঠিক, তাই বাবাকে বলে ভারি আরাম পেতাম।
আমার বই পড়ার শখ বাবার থেকে পাওয়া। মানুষটা কথাও বলত ভীষণ ভালো, খেলাধুলাতেও ভালো ছিল (এই গুণটা বুয়া পেয়েছে)।
একদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখলাম, বাবা খাতা নিয়ে আঁকছে, পাশে পুঁচকে তাতান – বাবা যে আঁকতে পারে, সে দিন জানলাম।
আমার সাথে প্রায় রোজ ঝামেলা হত খবরের কাগজ নিয়ে, লোকটা কিছুতেই কাগজ পড়ে গুছিয়ে রাখত না আর সব কাগজ একসাথে চাই তার, সে যখন পড়বে, কেউ কোনও কাগজ হাতে নিতে পারবে না। সারাদিন বিছানার একটা কোণায় শুয়ে থাকতো, বিছানা গোছাতেও দেবে না, তার ঘর অগোছালোই থাকুক – কি আজব বোঝো!
ম্যাজিক জানতো বাবা, সব্বাইকে খুব জলদি আপন করে নিতে পারত।
একটা ছবি মাঝে মাঝেই চোখে ভাসে – বিয়ের পর বম্বে যাচ্ছি, সারা স্টেশন ভর্তি আমার আপনজনেরা। ট্রেন ছাড়ল, বাবা আর কাকা দুজন ট্রেনের সাথে প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হাঁটতে লাগল, দুজনেরই চোখে জল। ট্রেন গতি বাড়াল, ওরাও বাড়াল – হাত নাড়িয়ে যাওয়াটা ভুলতে পারি না।
শুধু একটা আফশোস রয়ে গেছে , ২৭শে এপ্রিল, ২০১২, সকালের ভিসিটিং আওয়ারসে বাবার সাথে দেখা করতে গেছি। শুনলাম, বাবা খাচ্ছে না। বকুনি দিলাম। বাবা আমার হাতখানা চাইল, ধরে শুল, তখন তার পাশ ফিরতেও কষ্ট হয়। বেড-এর পাশে বসে বাবার মাথায় হাত বোলাচ্ছি, চোখ থেকে জল পড়ছে। বাবা বলল – ‘আমায় বাড়ি নিয়ে চল বুড়ি, তোদের কাছে যাব’ – শুনেই শব্দ করে কান্না বেড়িয়ে আসছিল। ছোটমশাই তক্ষুনি এল, আমি বাবার কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে বেড়িয়ে এসেছিলাম।
পারি নি বাবা, তোমার কথা রাখতে পারি নি।

Comments

Popular posts from this blog

‘হো’ওপনোপনো’

কথায় আছে লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো? ক্ষমা কি করা যায়, যদিও বা যায়... সেটা কি ভোলা সম্ভব? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় একটা বড় ভুমিকা নেয়, দিন যেতে যেতে ঘটনার অনুভুতির তীক্ষতা কমতে থাকে, আমরা মনে করি ‘ভুলে গেছি’; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য অনুরূপ কিছু হলে বা মনে পড়লেই দগদগে ভাব নির্লজ্জের মতন বেরিয়ে পরে।  হ্যাঁ, আমিও বলছি, ভালো থাকতে গেলে এই –“ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট” যাদুর মতন কাজ করে। একটা সত্যি ঘটনা বলি আজকে, আমার জীবনের। আমার বাড়ির পাশেই একটা কোচিং সেন্টারে আমার ছেলে পড়ত। ঘটনাক্রমে, সেন্টারহেডের ছেলেও আমার ছেলেরই ক্লাসের বন্ধু। প্রচলিত আছে, সেই সেন্টারহেড (নাম ধরে নিই ‘ক’বাবু) ভালো ছাত্রছাত্রী ছাড়া সেই সেন্টারে পড়ান না। তাই, আমার ছেলে যখন ক্লাস সেভেন (ছেলে আমার বরাবরই ৬০% পাওয়া – ছোটবেলায় লারনিং ডিসঅর্ডার ছিল) তখন তিনি তাকে যোগ্য মনে করেন নি সেই সেন্টারের। ক্লাস নাইনের সময়, আমি দেখলাম, ওর ক্লাসের অনেকজন ওই সেন্টারেই পড়ে আর বাড়ির পাশে বলে, আমারও সুবিধে হবে, অনেকগুলো পথ খরচ বেঁচে যাবে... এইসব ভেবে আবার গেলাম ‘ক’ বাবুর কাছে, অনুরোধ করলাম আমার ছেলেকে ভর্তির জন্য; বদলে ...

শিক্ষা

  একবার হয়েছে কি, ভীষণ উত্তেজনাবশতঃ বেশ কড়া দামে টিকিট কেটে দেখতে গিয়েছিলাম একটা সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। তারপর…. একঘণ্টা যেতে না যেতেই প্রান হাঁসফাঁস, হাত কামড়ানো। মনে যুদ্ধ চলছে – ‘এত খাজা ছবি কি করে হতে পারে’র সাথে ‘ঈশ, কত খরচ হয়ে গেল’র। ভাবতে ভাবতে, পকেট আরও খসিয়ে পপকর্ণ আর কোল্ড্রিঙ্কও খাওয়া হয়ে গেল। হল থেকে বেড়িয়ে কান মুলেছিলাম, এমন বোকামি আর হবে না, শপথ টপথও নিয়েছিলাম খানিক। বলুন তো, আসল বোকামিটা কোনটা ছিল? দামী টিকিট কেটে বাজে সিনেমা দেখা না কি সিনেমাটা বাজে বুঝেও, বেশি খরচ হয়ে গেছে এই ভেবে, হলে বসে নিজের সময় বরবাদ করে পুরো সিনেমাটা হজম করা? নিজেদের জীবনের দিকে একবার ভালো করে তাকাই তো; আমাদের সম্পর্কগুলোও অনেকটা এইরকম নয় কি? কাজ করছে না জেনেও, লেগে থাকি, সম্পর্কের ভার বয়ে চলি অনেক ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গেছে, লোকে কি বলবে… এইসব ভেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে যে সবচেয়ে দামী ইনভেস্টমেন্টটা পাঁকে চলে যাচ্ছে…মানে “সময়”…যেটা আর ফিরে আসবে না, তার কথা ভাবা হয়ে ওঠে না।   কিছুই কিন্তু অপূরণীয় নয়। আপনি না থাকলে, বা আমি না থাকলে সব কি থমকে যাবে? কিছুদিন আগে ইন্সটাগ্রামে একটা পোস্ট দেখে...

হাল্লা চলেছে যুদ্ধে!!

  শুন্ডির রাজা আজও অচেতন, হাল্লা চলেছে যুদ্ধে, আর আমরা ঘুমাই প্রতিক্রিয়ায়; স্বপক্ষে - বিরুদ্ধে। সকাল থেকে উঠে সারাদিন, তারপর সারারাত... কে কি ভাবছে, বলছে -করছে ভেবে যাই সাতপাঁচ। পুঁজি জমছে ব্যাঙ্কে আর সুগার-প্রেসার ঘরে; লাগামহীন অ্যাড্রিনালীন সর্বত্র ছিটকে পরে। মনখুলে আজ হাসতে গেলে ভরসা লাফিং ক্লাব, নিজেকে হারিয়ে ফেলার খেলায় মেতেছি আমরা সব। গুপী গাইন – বাঘা বাইন সিনেমা দেখে নি, এমন কেউ আছে কি? সিনেমার একটা গানের লাইন ‘হেডিং’ দিলাম লেখায় আর, শুরু করার সময় অনুরোধ রাখছি, আরেকটা গান মনে করার... “এক যে ছিল রাজা, তার ভারি দুখ”। এই গানটায় তিনটে প্রশ্ন করা হয়েছে– দুঃখ কীসে হয়, দুঃখ যাবে কি আর দুঃখ কীসে যায়। এবং উত্তরও দেওয়া হয়েছে (গানটা মনে করুন, নতুবা শুনে ফেলুন আরেকবার)। তো, আমি কেনই বা আজ এই কাজ করাচ্ছি আপনাদের দিয়ে, জানতে চাইবেন নিশ্চয়ই।   আরেকটা সিনেমার প্রসঙ্গ টেনে মুল কথায় আসার চেষ্টা করছি। কয়েকবছর আগে আমির খানের একটা ছবি এসেছিল, অ্যাডাল্ট ফিল্ম – ‘তারে জমীন পর’, হয়তো দেখে থাকবেন। অ্যাডাল্ট বললাম, কারণ, আমি সর্বতঃ ভাবে বিশ্বাস করি, সিনেমাটির মাধ্যমে যে ম্য...