Skip to main content

মা হওয়া কি মুখের কথা!

 


একটা ঢাঊশ পেট সমেত ৯২ কেজি ওজনের (আওয়াজ আসত , ৮ হলেই ১০০) একজন নার্সিংহোমে ভর্তি হল; রোজ সে ভাবে পেট থেকে কিছু একটা বেরোবে, কিন্তু বেরোয় না। বৃদ্ধা ডাক্তারণী বড্ড কড়া, পেইন না উঠলে..... শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চলবে নরম্যাল ডেলিভারির।
তারপর, পাঁচদিন পর সোমবার সকাল থেকে দেখা গেল, পেটের মধ্যে সব কেমন চুপচাপ। এবার ডাক্তারণী বললেন পেট কাটার কথা। প্যাঁক প্যাঁক করে ইঞ্জেকশান চলল; অনেক কিছু পরপর হল; বিকেল বেলা অপারেশান থিয়েটারে হাল্কা কথা কানে এলঃ “ছেলে হয়েছে”! তারপর কিছু মনে নেই। সন্ধ্যের দিকে ছেলের বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে কানে কানে জানাল-‘আমাদের ছেলে হয়েছে, একমাথা চুল’। (এই একমাথা চুলের একটা কেস আছে, মা টি মোটেই শাক-সব্জি খেত না, শাশুড়ি বলতেন, শাক না খেলে বাচ্চার চুল হয় না 😛 )
সেদিন রাতে যখন তাকে আমার পাশে শোওয়ানো হল, ছোট্ট মুখে প্রথমেই একজোড়া পাতলা ঠোঁট দেখেছিলাম, খুব ভাললাগছিল ভাবতে যে এত্ত সুন্দর একটা মানুষ আমার পেটুর মধ্যে এতদিন ছিল! আরও একটা গর্বের বিষয়, যে ডাক্তারণী আমাকে আমার মায়ের পেট থেকে বের করেছিলেন, সেই ডাক্তারণী আমার পেট থেকে আমার ছেলেকেও বের করেছেন!!!
মজাটা হল পরের দিন সকালে। ভিসিটিং আওয়ারে কেবিনে প্রথম এল ছেলের বাবা, মায়ের পাশে কট-এ ছেলে; ছেলের কাছে দাঁড়িয়ে কর্তব্যরত আয়াকে জিজ্ঞেস করল-“ছেলে কেমন আছে?” সে উত্তর দিল, সারারাত খুব কেঁদেছে। বাবার প্রশ্নঃ ক্ষিদের জন্য? উত্তরঃ হ্যাঁ, জল খাওয়ানো হয়েছে। এরপর ঘরে ঢুকল মায়ের বাবা! প্রশ্নঃ কেমন আছিস? মেয়ে উত্তর দেওয়ার আগেই আয়া বললেন- সারারাত জেগে আছে, নাতি তো সারারাত কেঁদেছে। কটের কাছে গিয়ে বাবা বললেন – এই যো ছেলে, কেন দুষ্টুমি করেছ? আমার মেয়েটাকে কেন কষ্ট দিয়েছ? এরপর মেয়ের বাবা বেড়িয়ে যাবার পর, ছেলের বাবা নতুন মা কে এসে বলে- তোমার বাবা কিন্তু এটা ঠিক করলেন না, আমার ছেলেকে এভাবে বকলেন কেন? - সমস্তটা দেখে মেয়েটি মুখ টিপে টিপে শুধু হেসে গেছে।
ব্যাঙ্গাচির মতন কুচো মানুষটাকে জ্যান্ত খেলনা মনে হত। স্নান করাতে ভয় লাগত, কিন্তু সাজাতে গোজাতে ভারি ভালবাসতাম। একবার মুখে পাউডার লাগাতে গিয়ে চোখে পড়ে গেল, পরে যখন চোখ দেখাতে গিয়ে ডাক্তার বলল চশমা দিতে হবে, আকুল মনে জিজ্ঞেস করেছিলুম- সেই পাউডার পড়ে যাবার জন্য কিছু হয় নি তো! ডাক্তারের হাসিটা ভরসা যুগিয়েছিল।
আমি বরাবর স্কুলে টু মাচ টকেটিভ-এর লেবেল পেয়ে এসেছি। আর আমার তাতান (এই নামটা কিন্তু ওর নিজের দেওয়া। ওকে ডাকতাম বুতান বলে, দিঘায় গেছি ওকে নিয়ে, এই দু বছর তখন ওর। ওকে ওখানে একজন যখন নাম জিজ্ঞেস করে; ও নিজে থেকেই নিজের নাম বলে-তাতান।)কথা বলেছে বেশ দেরীতে। ঈশারা আর অদ্ভুত শব্দ করে কমিউনিকেট করত। তালুতে জিভ ঠেকিয়ে ‘টক’ শব্দ করলে বুঝতে হত জল চাইছে, দু বার ‘টক টক’ মানে ক্ষিদে পেয়েছে। বেলুন মানে ‘বম’। অনায়াসে A B C D বলত , আর E বলার সময় শুনতাম ‘বাব্বা’। সবচেয়ে কসরত করতে হয়েছে অ আ ক খ শেখাতে। ‘ঢিশক্যাঁও’ বলে বলে ঢ , খ্যাঁক খ্যাঁক বলে খ, গরররর বলে গ ...... এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়েছিলাম।
তাতান একটা ঠাকুরকেই চেনে – রবিঠাকুর। বাকিসব কালিআনটি, দুর্গাআনটি, সরস্বতীআনটি। ছোটবেলায় অসুরআঙ্কেলকে ও ভীষণ পছন্দ করত- বেশ হ্যান্ডসাম লাগত ওর। একবার রাবণের ছবি দেখে আমায় জিজ্ঞেস করেছিল – মা, রাবণ ব্রাশ করে কি ভাবে? আরেকবার প্রশ্নবাণঃ আচ্ছা মা! টয়লেট পেলে তো সবাই তাড়াতাড়ি ছুটে যায়... তাহলে লেট ক্যানো আছে?
ওকে বলেছিলাম, পড়াশোনা না করলে রাস্তায় সবজি বেচতে হবে, আমার সাথে বেড়িয়ে একদিন এক সব্জিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করেছিল – তুমি পড়াশোনা করনি না? জাস্ট বুঝুন আমার অবস্থা!!
ছোটবেলায় দুষ্টুমি করলে, ওর জন্য একটা শাস্তি বজায় ছিলঃ ওকে বলতাম –‘আমায় তুমি ‘মা’ বলে ডাকবে না, ‘জয়তি’ বলবে’। কিছুক্ষন পর দেখতাম, মুখ কাঁচুমাঁচু করে বলতঃ –‘খুব কষ্ট হচ্ছে, প্লিস একবার মা বলি?’
এখন তো ছেলে ভারি মাতব্বর হয়ে গেছে; কথায় কথায় ও কে কিছু বারন করার সময় ‘না না’ বল্লে – তিনি বলেন – ‘পাটেকার’। ওকে কখনও জিজ্ঞেস করবেন –‘ক’টা বাজে’? ওর উত্তর হয় –‘কেউ বাজে নয়, সব্বাই ভালো’। ‘কোথায় যাচ্ছিস’? তাতানের উত্তর –‘বাবুদের তালপুকুরে’।
আমাকে তো চ্যালেঞ্জ জানায় – বকে দেখাবার জন্য! আমি বকি আর ও আমায় রেট করে – দশে চার, দশে তিন! ওর হিসেবে আমি কখনোই পাঁচ ক্রস করি না- মানে আমি নাকি বকতেই পারি না!! কি ভীষণ খারাপ ব্যাপার .......
একবার বাড়ি এলাম একগোছা অর্কিড হাতে নিয়ে, দরজা খুলতেই আমায় বলল-‘Wow! At last!! Someone has proposed you!! Isn’t it?” আমি বললাম, আমার এক ছাত্রী আমায় দিয়েছে, শুনে বলল –‘বুঝেছি, তোমার দ্বারা কিস্যু হবে না’।
কোনও কারণে একদিন খুব আপসেট ছিলাম। চোখের জল এমনি এমনি পড়ে যাচ্ছিল। বাড়িতে বলেছিলাম, একটু একা থাকতে দাও। হঠাৎ দেখালাম, এসে কোলে শুয়ে পড়ল, গলা জড়িয়ে বল্ল-‘আমি তো আছি, সব ঠিক হয়ে যাবে’ – মুহূর্তে সত্যিই সব ঠিক হয়ে গেল।
এই কিছুদিন আগে, খুব মুখে মুখে কথা বলা শুরু করেছে, বেদম রাগারাগি হল। আমি কথা বন্ধ করে দিলাম। প্রায় দু ঘণ্টা কথা বলি নি – ও এক ঘরে, আমি এক ঘরে। এমন আবহাওয়া তৈরি করেছিলাম যে, আমার ঘরে আসার সাহসই পাবে না 😉 । দুপুরে মা খেতে ডাকল, খেতে গিয়ে চোখ গেল হোয়াইট বোর্ডের দিকে, দরজার পাশে রাখা হয়েছে – সেখানে অনেক বার “I am sorry , I Love you” লেখা আর সাথে লেখা ‘বাচ্চে কি জান লোগে ক্যায়া?” আচ্ছা, এরপর কি কেউ রাগ করে থাকতে পারে!!
এই হল আমার তাতান আর আমার সম্পর্কের খানিক ঝলক।
মাঝে মাঝে অবাক হই – সত্যি আমি মা হতে পারছি কি?
আমার সব সিদ্ধান্ত নেওয়া টেবিলে বসে মা-আর তাতানের সাথে কথা বলে।
এমনও দিন গেছে – আমাদের বসিয়ে তাতান আমাদের দুজনের ক্লাস নিয়েছে। বলেছে, এটা তুমি করবে, ওটা বুয়ামা করবে। খুব ভালো অভিজ্ঞতা সেগুলো। ছেলেকে দেখে নিশ্চিন্ত লাগে, আমি না থাকলেও, ও পারবে এগিয়ে যেতে।
জীবনের কাঠিন্য ও ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে, আজ নিজে দু হাত ছড়িয়ে যখন বলে – লাইফ ইস বিউটিফুল, ভারি খুশি হই।
১৬ বছর....... দুচোখে ভর্তি স্বপ্ন.....
ইট ইস ভেরি সিম্পেল তাতান। স্বপ্নগুলোকে ছোঁয়া সম্ভব। জীবনের মত শিক্ষা আর কেউ দেয় না। কমপ্লেন নয়, আ্যপ্রিশিয়েশানে জীবন ভরিয়ে দে, জীবন তোকে প্রতি পদে আ্যপ্রিশিয়েটেড হবার সুযোগ করে দেবে।
16 year ago today
They placed you in my arms
I became a mother
Bewitched by all your charms
You learned to walk, to read
Each day brought something new
No more my little boy
You hurt, I cried, you grew
Sometimes you didn't need me
didn't want to hold my hand
Your independence made you proud
But me a little sad.
I blinked my eyes, I turned around
you’re almost grown I see
Why did it go so fast?
A few more moments, please
In your struggle to be free
Sometimes we don't get along
But I'm always on your side
I'll always be your mom.
You can't stop time, can't hold it back
Can't stop the ocean's tide
The good person that you are
Fills my heart with pride
In my eyes, there is no one like you
Can't wait to see what you'll become
My pride and joy, I love you
Happy birthday to my Tatan.



Comments

Popular posts from this blog

‘হো’ওপনোপনো’

কথায় আছে লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো? ক্ষমা কি করা যায়, যদিও বা যায়... সেটা কি ভোলা সম্ভব? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় একটা বড় ভুমিকা নেয়, দিন যেতে যেতে ঘটনার অনুভুতির তীক্ষতা কমতে থাকে, আমরা মনে করি ‘ভুলে গেছি’; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য অনুরূপ কিছু হলে বা মনে পড়লেই দগদগে ভাব নির্লজ্জের মতন বেরিয়ে পরে।  হ্যাঁ, আমিও বলছি, ভালো থাকতে গেলে এই –“ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট” যাদুর মতন কাজ করে। একটা সত্যি ঘটনা বলি আজকে, আমার জীবনের। আমার বাড়ির পাশেই একটা কোচিং সেন্টারে আমার ছেলে পড়ত। ঘটনাক্রমে, সেন্টারহেডের ছেলেও আমার ছেলেরই ক্লাসের বন্ধু। প্রচলিত আছে, সেই সেন্টারহেড (নাম ধরে নিই ‘ক’বাবু) ভালো ছাত্রছাত্রী ছাড়া সেই সেন্টারে পড়ান না। তাই, আমার ছেলে যখন ক্লাস সেভেন (ছেলে আমার বরাবরই ৬০% পাওয়া – ছোটবেলায় লারনিং ডিসঅর্ডার ছিল) তখন তিনি তাকে যোগ্য মনে করেন নি সেই সেন্টারের। ক্লাস নাইনের সময়, আমি দেখলাম, ওর ক্লাসের অনেকজন ওই সেন্টারেই পড়ে আর বাড়ির পাশে বলে, আমারও সুবিধে হবে, অনেকগুলো পথ খরচ বেঁচে যাবে... এইসব ভেবে আবার গেলাম ‘ক’ বাবুর কাছে, অনুরোধ করলাম আমার ছেলেকে ভর্তির জন্য; বদলে ...

শিক্ষা

  একবার হয়েছে কি, ভীষণ উত্তেজনাবশতঃ বেশ কড়া দামে টিকিট কেটে দেখতে গিয়েছিলাম একটা সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। তারপর…. একঘণ্টা যেতে না যেতেই প্রান হাঁসফাঁস, হাত কামড়ানো। মনে যুদ্ধ চলছে – ‘এত খাজা ছবি কি করে হতে পারে’র সাথে ‘ঈশ, কত খরচ হয়ে গেল’র। ভাবতে ভাবতে, পকেট আরও খসিয়ে পপকর্ণ আর কোল্ড্রিঙ্কও খাওয়া হয়ে গেল। হল থেকে বেড়িয়ে কান মুলেছিলাম, এমন বোকামি আর হবে না, শপথ টপথও নিয়েছিলাম খানিক। বলুন তো, আসল বোকামিটা কোনটা ছিল? দামী টিকিট কেটে বাজে সিনেমা দেখা না কি সিনেমাটা বাজে বুঝেও, বেশি খরচ হয়ে গেছে এই ভেবে, হলে বসে নিজের সময় বরবাদ করে পুরো সিনেমাটা হজম করা? নিজেদের জীবনের দিকে একবার ভালো করে তাকাই তো; আমাদের সম্পর্কগুলোও অনেকটা এইরকম নয় কি? কাজ করছে না জেনেও, লেগে থাকি, সম্পর্কের ভার বয়ে চলি অনেক ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গেছে, লোকে কি বলবে… এইসব ভেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে যে সবচেয়ে দামী ইনভেস্টমেন্টটা পাঁকে চলে যাচ্ছে…মানে “সময়”…যেটা আর ফিরে আসবে না, তার কথা ভাবা হয়ে ওঠে না।   কিছুই কিন্তু অপূরণীয় নয়। আপনি না থাকলে, বা আমি না থাকলে সব কি থমকে যাবে? কিছুদিন আগে ইন্সটাগ্রামে একটা পোস্ট দেখে...

নিশিদিন আলোক শিখা জ্বলুক প্রাণে

  জীবনের সবকিছু আমাদের শেখায়। যাদের সাথে দেখা হয়, যাদের সাথে থাকা হয়, যাদের কথা ভাবা হয়, যা যা ঘটে  … সবার থেকে কিছু না কিছু শিখতে পারা যায়। বা, বলা ভালো- শিখতে পারতে হয়, শিখতে জানতে হয়। কারণ, শিখতে পারলে এইসবই আমাদের কাছে “অভিজ্ঞতা” যা জীবন চলতে সাহায্য করে। নতুবা, এগুলোই আমাদের যাবতীয় অ-সুখের কারণ।    তাই, আমাদের প্রতিটা মুহূর্তের ঘটে যাওয়া, ঘটতে থাকা ঘটনাগুলো, ঘটনার কুশীলব সকলেই আমাদের শিক্ষক।   এইসব শিক্ষকদের অবহেলা করবেন না। যখন আপনি মনের মতন চাকরি পাচ্ছেন না, বা যখন কোনও সম্পর্ক প্রশ্নচিহ্নের সামনে, অথবা যখন আপনার বিরুদ্ধে সব ঘটছে, আপনি সমস্যার সম্মুখীন, সেই মুহূর্তে এই শেখার পাঠ আরও বেশি করে মনে করুন। কবি তো বলেই গেছেন কতভাবে – “আরও বেদনা, আরও বেদনা, প্রভু দাও মোরে আরও চেতনা”… “চির পিপাসিত বাসনা-বেদনা, বাঁচাও তাহারে মারিয়া…” “আমি বহু বাসনাই প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে”….. গানগুলো শোনা হয়, গাওয়া হয়, কিন্তু অর্থটাই বোধগম্য হতে পারে না। সমস্যার সময়ে নিজের জীবনের শিক্ষাগুলোকে মনে করে ফেলতে পারলেই কিন্তু সেই পরীক্ষাটা সহজে পাশ করা হয়ে যাবে। যে সব অবস...