ট্রেনটা চলছে, জানলার ধারে বসে বসে দেখছি গাছ, মাঠ, গরু, পাখী, মানুষগুলো সব দৌড়চ্ছে, আমায় কেউ ধরতে পারছে না .... সব্বাইকে ছেড়ে আমি চললাম।
সত্যি তো, সব ছেড়েই তো যাচ্ছি আমি.... এক নতুনের উদ্দেশ্যে! একদম আনকোরা এক জীবন; অনেক এনার্জি লাগবে....
যা হয় ভালোর জন্যই হয়!
একটা চোরা দীর্ঘশ্বাস পড়ল কি? না না ... এই নিঃশ্বাসটা আত্মবিশ্বাসের।
কোমর অব্দি লম্বা চুলকে কাটার সময় বুকটা হু হু করছিল; বদলে যাবার শুরুটা এভাবেই হয়েছিল।
ইনভল্ভমেন্ট, অ্যাটাচমেন্ট – প্রায় একমাস লেগেছিল লিস্ট বানাতে। শেষে দেখা গেল, তালিকাটি বৃহদাকার; খাতা জোড়া ।
ঘরের মধ্যে গুমরে গুমরে অনেক সময় নষ্ট করে, সোশ্যাল মিডিয়ার সব অ্যাকাউন্টগুলোকে ডিলিট করে, ফোনের পুরনো সিমকে জলাহুতি দিয়ে-নতুন নম্বর নিয়ে (যে নম্বর শুধু খানকতক মানুষই জানে), পুরনো মেইল আইডি হত্যা করে, এক নতুন শুরুকে আহ্বান জানিয়েছি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে দিনের পর দিন কথা বলেছি, ভালবাসতে পেরেছি নিজেকে, বিশ্বাস করতে পেরেছি নিজেকে, নিজের উপর আবার নতুন করে ভরসা করার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছি; তাই তো এই নতুন শুরু!
না,আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। এতদিনে নিজেকে খুঁজে পেয়েছি; নিজের ভালোলাগাগুলোকে নিয়ে বাঁচতে যাচ্ছি আমি।
ক’দিন ধরে দেখছিলাম, ভেতরে ভেতরে কতটা বদল এসেছে আমার; যে আমি আগে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ভারি উদ্ভ্রান্ত হয়ে পরতাম..চোখের জল ফেলতাম.... এখন; সেইসব কিছু ঘটলেও আর ওইরকম কিছু হয় না, নিজেকে বেশ কয়েকবার খুঁচিয়ে দেখেছি; নাহ! হচ্ছে না!! পিঠ চাপড়েছি নিজের!! ব্র্যাভো !!!
আমার সাথে এখন ব্যাগ ভর্তি বই। আসার আগে, যত পেরেছি, মনের মতন বই কিনেছি। আর আছে, রঙ বেরঙের কাগজের খাতা। শেয়ালদার বৈঠকখানা বাজার ঘুরে ঘুরে কাগজ কিনে খাতা বানিয়েছি আমি। ওইগুলোতে এইবার লেখা শুরু হবে।
জীবনের এই জার্নিতে বহু স্মৃতি, বহু মানুষ, বহু ঘটনা .... চোখ বন্ধ করে যখন মন-কুঠুরিতে ডুব দিই; দেখি, কত্ত মণি-মাণিক্য !! আগে যা ভেবে কষ্ট হত, আগে যা মনে পড়লেই গলার কাছে কান্না আটকে থাকত; এখন সেগুলো এক অন্য আঙ্গিকে মনে পড়ে; সব লিখব.... অনেক লিখতে হবে.... রঙ্গিন পাতাগুলোকে তাই তো সাথে নিয়েছি।
চিঠি লিখতে ভীষণ ভালো লাগত, চিঠি পেতেও। প্রচুর খাম কিনেছি। সব্বার ঠিকানা নিয়ে এসেছি, সব্বাইকে চিঠি লিখব; বলেও এসেছি- আমার সাথে যোগাযোগের একমাত্র উপায় চিঠি! (অনেকেই ব্যোমকে গ্যাছে) হা হা হা !!
একটা সময় ছিল, সমুদ্র খুব টানত আমায়। সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন ঢেউগুলো আছড়ে পড়ত পায়ের উপর, নিজেকে রাজনন্দিনী মনে হত, মনে হত কি অসম্ভব ভাগ্য আমার, বিশাল সৃষ্টি হুমড়ি দিয়ে পায়ে পড়ে জানাচ্ছে আমায় আমার ভেতর কি মহাশক্তি লুকিয়ে আছে। নির্জন রাতের সমুদ্রের গর্জন যেন আমায় বলত; ‘হে রাজনন্দিনী! তোমার সকল ইচ্ছাপূরণই হল আমার একমাত্র লক্ষ্য’। অনাবিল আনন্দে ভেসে যেতাম আমি।
এখন যাচ্ছি পাহাড়ে; এক বিশাল একাকীত্ব দ্বারা প্রাণিত হতে।
দিনটা ভারি সুন্দর। মেঘলা মেঘলা। অনেকদিন বাদে স্লিপার ক্লাসে যাচ্ছি। ট্রেনের গতি হাওয়াসাগর চিড়ে দুর্দম বেগে এগোচ্ছে। চুল এলোমেলো- বেসামাল। হাওয়ার দাপট বইয়ের পাতাকে অবাধ্য করে ফেলছে। অগত্যা বই বন্ধ করে প্রকৃতি উপভোগ। সত্যি তো; বই তো যখন তখন পড়তে পারব, কিন্তু ঘাস-মাঠ-গাছ-আকাশ এই ভাবে তো দেখা হয় না; উতল হাওয়া শিখিয়ে দিল আবার।
আস্তে আস্তে ‘জীবন-স্যারের’ বাধ্য ছাত্রী হয়ে উঠছি। একটা সত্য অসম্ভব প্রকট হচ্ছে দিনের পর দিন ; যত বয়স বাড়ছে, মোক্ষম বোধ হচ্ছে – ‘অনেক কিছু জানতে বাকি’। এখন প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি, কেউ যেন আমার প্রতি সর্বদা নজর রাখছে, রাস্তায় হোঁচট খাই; আর মনে হয় কেউ যেন আমায় বলল – ‘সাবধানে পথ চল’; আরও সাবধানী হয়ে যাই। হঠাত অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ!কেউ যেন আমায় বলে –‘শরীরের দিকে নজর দাও’। রাস্তার ধারে কনক্রিট ফাটিয়ে ওঠা ছোট্ট চারাগাছটা সেদিন আমায় যেন ডেকে বলল – ‘আমি যদি পারি, তুমি পারবে না?’
হেয়ার ব্যান্ড আর গোটা পাঁচেক ক্লিপের বাঁধুনিও দুর্বল হয়ে পড়ছে, ছোট চুলের এ ভারি বিড়ম্বনা। মিঠে হাওয়ায় চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কুউউউ ঝিক ঝিক ঝিক শব্দের মাদকতা বন্ধ চোখে সিনেমার স্ক্রিন খুলে দিল। আমি দেখছি - একটা বড় অডিটোরিয়াম, সামনে বিশাল স্টেজ। অডিটোরিয়ামের সিটে একা আমি বসে আছি। স্টেজে বড় একটা স্পট লাইট এসে পড়ল। একদম স্টেজের মাঝখানে; আস্তে আস্তে একটা কালো কাপড়ে ঢাকা শরীর স্টেজে এসে দাঁড়াল, লাইটের মাঝে। ভীষণ একটা ভালো গন্ধ পেলাম, অচেনা – হয়তো কোনও বুনোফুলের।
ব্যাকগ্রাউন্ডে হাল্কা একটা সুর, মন ভালো করা।শরীর থেকে কালো কাপড়টা খসল;
একি !
ক্রমশঃ
- Get link
- X
- Other Apps
- Get link
- X
- Other Apps

Comments
Post a Comment