Skip to main content

উপলব্ধি (প্রথম পর্ব)

 


ট্রেনটা চলছে, জানলার ধারে বসে বসে দেখছি গাছ, মাঠ, গরু, পাখী, মানুষগুলো সব দৌড়চ্ছে, আমায় কেউ ধরতে পারছে না .... সব্বাইকে ছেড়ে আমি চললাম।
সত্যি তো, সব ছেড়েই তো যাচ্ছি আমি.... এক নতুনের উদ্দেশ্যে! একদম আনকোরা এক জীবন; অনেক এনার্জি লাগবে....
যা হয় ভালোর জন্যই হয়!
একটা চোরা দীর্ঘশ্বাস পড়ল কি? না না ... এই নিঃশ্বাসটা আত্মবিশ্বাসের।
কোমর অব্দি লম্বা চুলকে কাটার সময় বুকটা হু হু করছিল; বদলে যাবার শুরুটা এভাবেই হয়েছিল।
ইনভল্ভমেন্ট, অ্যাটাচমেন্ট – প্রায় একমাস লেগেছিল লিস্ট বানাতে। শেষে দেখা গেল, তালিকাটি বৃহদাকার; খাতা জোড়া ।
ঘরের মধ্যে গুমরে গুমরে অনেক সময় নষ্ট করে, সোশ্যাল মিডিয়ার সব অ্যাকাউন্টগুলোকে ডিলিট করে, ফোনের পুরনো সিমকে জলাহুতি দিয়ে-নতুন নম্বর নিয়ে (যে নম্বর শুধু খানকতক মানুষই জানে), পুরনো মেইল আইডি হত্যা করে, এক নতুন শুরুকে আহ্বান জানিয়েছি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে দিনের পর দিন কথা বলেছি, ভালবাসতে পেরেছি নিজেকে, বিশ্বাস করতে পেরেছি নিজেকে, নিজের উপর আবার নতুন করে ভরসা করার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছি; তাই তো এই নতুন শুরু!
না,আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। এতদিনে নিজেকে খুঁজে পেয়েছি; নিজের ভালোলাগাগুলোকে নিয়ে বাঁচতে যাচ্ছি আমি।
ক’দিন ধরে দেখছিলাম, ভেতরে ভেতরে কতটা বদল এসেছে আমার; যে আমি আগে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ভারি উদ্ভ্রান্ত হয়ে পরতাম..চোখের জল ফেলতাম.... এখন; সেইসব কিছু ঘটলেও আর ওইরকম কিছু হয় না, নিজেকে বেশ কয়েকবার খুঁচিয়ে দেখেছি; নাহ! হচ্ছে না!! পিঠ চাপড়েছি নিজের!! ব্র্যাভো !!!
আমার সাথে এখন ব্যাগ ভর্তি বই। আসার আগে, যত পেরেছি, মনের মতন বই কিনেছি। আর আছে, রঙ বেরঙের কাগজের খাতা। শেয়ালদার বৈঠকখানা বাজার ঘুরে ঘুরে কাগজ কিনে খাতা বানিয়েছি আমি। ওইগুলোতে এইবার লেখা শুরু হবে।
জীবনের এই জার্নিতে বহু স্মৃতি, বহু মানুষ, বহু ঘটনা .... চোখ বন্ধ করে যখন মন-কুঠুরিতে ডুব দিই; দেখি, কত্ত মণি-মাণিক্য !! আগে যা ভেবে কষ্ট হত, আগে যা মনে পড়লেই গলার কাছে কান্না আটকে থাকত; এখন সেগুলো এক অন্য আঙ্গিকে মনে পড়ে; সব লিখব.... অনেক লিখতে হবে.... রঙ্গিন পাতাগুলোকে তাই তো সাথে নিয়েছি।
চিঠি লিখতে ভীষণ ভালো লাগত, চিঠি পেতেও। প্রচুর খাম কিনেছি। সব্বার ঠিকানা নিয়ে এসেছি, সব্বাইকে চিঠি লিখব; বলেও এসেছি- আমার সাথে যোগাযোগের একমাত্র উপায় চিঠি! (অনেকেই ব্যোমকে গ্যাছে) হা হা হা !!
একটা সময় ছিল, সমুদ্র খুব টানত আমায়। সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন ঢেউগুলো আছড়ে পড়ত পায়ের উপর, নিজেকে রাজনন্দিনী মনে হত, মনে হত কি অসম্ভব ভাগ্য আমার, বিশাল সৃষ্টি হুমড়ি দিয়ে পায়ে পড়ে জানাচ্ছে আমায় আমার ভেতর কি মহাশক্তি লুকিয়ে আছে। নির্জন রাতের সমুদ্রের গর্জন যেন আমায় বলত; ‘হে রাজনন্দিনী! তোমার সকল ইচ্ছাপূরণই হল আমার একমাত্র লক্ষ্য’। অনাবিল আনন্দে ভেসে যেতাম আমি।
এখন যাচ্ছি পাহাড়ে; এক বিশাল একাকীত্ব দ্বারা প্রাণিত হতে।
দিনটা ভারি সুন্দর। মেঘলা মেঘলা। অনেকদিন বাদে স্লিপার ক্লাসে যাচ্ছি। ট্রেনের গতি হাওয়াসাগর চিড়ে দুর্দম বেগে এগোচ্ছে। চুল এলোমেলো- বেসামাল। হাওয়ার দাপট বইয়ের পাতাকে অবাধ্য করে ফেলছে। অগত্যা বই বন্ধ করে প্রকৃতি উপভোগ। সত্যি তো; বই তো যখন তখন পড়তে পারব, কিন্তু ঘাস-মাঠ-গাছ-আকাশ এই ভাবে তো দেখা হয় না; উতল হাওয়া শিখিয়ে দিল আবার।
আস্তে আস্তে ‘জীবন-স্যারের’ বাধ্য ছাত্রী হয়ে উঠছি। একটা সত্য অসম্ভব প্রকট হচ্ছে দিনের পর দিন ; যত বয়স বাড়ছে, মোক্ষম বোধ হচ্ছে – ‘অনেক কিছু জানতে বাকি’। এখন প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি, কেউ যেন আমার প্রতি সর্বদা নজর রাখছে, রাস্তায় হোঁচট খাই; আর মনে হয় কেউ যেন আমায় বলল – ‘সাবধানে পথ চল’; আরও সাবধানী হয়ে যাই। হঠাত অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ!কেউ যেন আমায় বলে –‘শরীরের দিকে নজর দাও’। রাস্তার ধারে কনক্রিট ফাটিয়ে ওঠা ছোট্ট চারাগাছটা সেদিন আমায় যেন ডেকে বলল – ‘আমি যদি পারি, তুমি পারবে না?’
হেয়ার ব্যান্ড আর গোটা পাঁচেক ক্লিপের বাঁধুনিও দুর্বল হয়ে পড়ছে, ছোট চুলের এ ভারি বিড়ম্বনা। মিঠে হাওয়ায় চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কুউউউ ঝিক ঝিক ঝিক শব্দের মাদকতা বন্ধ চোখে সিনেমার স্ক্রিন খুলে দিল। আমি দেখছি - একটা বড় অডিটোরিয়াম, সামনে বিশাল স্টেজ। অডিটোরিয়ামের সিটে একা আমি বসে আছি। স্টেজে বড় একটা স্পট লাইট এসে পড়ল। একদম স্টেজের মাঝখানে; আস্তে আস্তে একটা কালো কাপড়ে ঢাকা শরীর স্টেজে এসে দাঁড়াল, লাইটের মাঝে। ভীষণ একটা ভালো গন্ধ পেলাম, অচেনা – হয়তো কোনও বুনোফুলের।

ব্যাকগ্রাউন্ডে হাল্কা একটা সুর, মন ভালো করা।শরীর থেকে কালো কাপড়টা খসল;

একি !

ক্রমশঃ

Comments

Popular posts from this blog

‘হো’ওপনোপনো’

কথায় আছে লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো? ক্ষমা কি করা যায়, যদিও বা যায়... সেটা কি ভোলা সম্ভব? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় একটা বড় ভুমিকা নেয়, দিন যেতে যেতে ঘটনার অনুভুতির তীক্ষতা কমতে থাকে, আমরা মনে করি ‘ভুলে গেছি’; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য অনুরূপ কিছু হলে বা মনে পড়লেই দগদগে ভাব নির্লজ্জের মতন বেরিয়ে পরে।  হ্যাঁ, আমিও বলছি, ভালো থাকতে গেলে এই –“ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট” যাদুর মতন কাজ করে। একটা সত্যি ঘটনা বলি আজকে, আমার জীবনের। আমার বাড়ির পাশেই একটা কোচিং সেন্টারে আমার ছেলে পড়ত। ঘটনাক্রমে, সেন্টারহেডের ছেলেও আমার ছেলেরই ক্লাসের বন্ধু। প্রচলিত আছে, সেই সেন্টারহেড (নাম ধরে নিই ‘ক’বাবু) ভালো ছাত্রছাত্রী ছাড়া সেই সেন্টারে পড়ান না। তাই, আমার ছেলে যখন ক্লাস সেভেন (ছেলে আমার বরাবরই ৬০% পাওয়া – ছোটবেলায় লারনিং ডিসঅর্ডার ছিল) তখন তিনি তাকে যোগ্য মনে করেন নি সেই সেন্টারের। ক্লাস নাইনের সময়, আমি দেখলাম, ওর ক্লাসের অনেকজন ওই সেন্টারেই পড়ে আর বাড়ির পাশে বলে, আমারও সুবিধে হবে, অনেকগুলো পথ খরচ বেঁচে যাবে... এইসব ভেবে আবার গেলাম ‘ক’ বাবুর কাছে, অনুরোধ করলাম আমার ছেলেকে ভর্তির জন্য; বদলে ...

শিক্ষা

  একবার হয়েছে কি, ভীষণ উত্তেজনাবশতঃ বেশ কড়া দামে টিকিট কেটে দেখতে গিয়েছিলাম একটা সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। তারপর…. একঘণ্টা যেতে না যেতেই প্রান হাঁসফাঁস, হাত কামড়ানো। মনে যুদ্ধ চলছে – ‘এত খাজা ছবি কি করে হতে পারে’র সাথে ‘ঈশ, কত খরচ হয়ে গেল’র। ভাবতে ভাবতে, পকেট আরও খসিয়ে পপকর্ণ আর কোল্ড্রিঙ্কও খাওয়া হয়ে গেল। হল থেকে বেড়িয়ে কান মুলেছিলাম, এমন বোকামি আর হবে না, শপথ টপথও নিয়েছিলাম খানিক। বলুন তো, আসল বোকামিটা কোনটা ছিল? দামী টিকিট কেটে বাজে সিনেমা দেখা না কি সিনেমাটা বাজে বুঝেও, বেশি খরচ হয়ে গেছে এই ভেবে, হলে বসে নিজের সময় বরবাদ করে পুরো সিনেমাটা হজম করা? নিজেদের জীবনের দিকে একবার ভালো করে তাকাই তো; আমাদের সম্পর্কগুলোও অনেকটা এইরকম নয় কি? কাজ করছে না জেনেও, লেগে থাকি, সম্পর্কের ভার বয়ে চলি অনেক ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গেছে, লোকে কি বলবে… এইসব ভেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে যে সবচেয়ে দামী ইনভেস্টমেন্টটা পাঁকে চলে যাচ্ছে…মানে “সময়”…যেটা আর ফিরে আসবে না, তার কথা ভাবা হয়ে ওঠে না।   কিছুই কিন্তু অপূরণীয় নয়। আপনি না থাকলে, বা আমি না থাকলে সব কি থমকে যাবে? কিছুদিন আগে ইন্সটাগ্রামে একটা পোস্ট দেখে...

নিশিদিন আলোক শিখা জ্বলুক প্রাণে

  জীবনের সবকিছু আমাদের শেখায়। যাদের সাথে দেখা হয়, যাদের সাথে থাকা হয়, যাদের কথা ভাবা হয়, যা যা ঘটে  … সবার থেকে কিছু না কিছু শিখতে পারা যায়। বা, বলা ভালো- শিখতে পারতে হয়, শিখতে জানতে হয়। কারণ, শিখতে পারলে এইসবই আমাদের কাছে “অভিজ্ঞতা” যা জীবন চলতে সাহায্য করে। নতুবা, এগুলোই আমাদের যাবতীয় অ-সুখের কারণ।    তাই, আমাদের প্রতিটা মুহূর্তের ঘটে যাওয়া, ঘটতে থাকা ঘটনাগুলো, ঘটনার কুশীলব সকলেই আমাদের শিক্ষক।   এইসব শিক্ষকদের অবহেলা করবেন না। যখন আপনি মনের মতন চাকরি পাচ্ছেন না, বা যখন কোনও সম্পর্ক প্রশ্নচিহ্নের সামনে, অথবা যখন আপনার বিরুদ্ধে সব ঘটছে, আপনি সমস্যার সম্মুখীন, সেই মুহূর্তে এই শেখার পাঠ আরও বেশি করে মনে করুন। কবি তো বলেই গেছেন কতভাবে – “আরও বেদনা, আরও বেদনা, প্রভু দাও মোরে আরও চেতনা”… “চির পিপাসিত বাসনা-বেদনা, বাঁচাও তাহারে মারিয়া…” “আমি বহু বাসনাই প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে”….. গানগুলো শোনা হয়, গাওয়া হয়, কিন্তু অর্থটাই বোধগম্য হতে পারে না। সমস্যার সময়ে নিজের জীবনের শিক্ষাগুলোকে মনে করে ফেলতে পারলেই কিন্তু সেই পরীক্ষাটা সহজে পাশ করা হয়ে যাবে। যে সব অবস...