Skip to main content

আমার বিশ্বকর্মা পুজো

 

একটা কথা আছে না – “What you are seeking is seeking you” ... আজকের গপ্পোটা এই কথাটাকেই প্রমান করবে।
সময়টা জুন মাস। নিজে সবসময় পজিটিভ থাকার চেষ্টা করি – এই সময়টায় আমার যে একটা গুরুতর পরীক্ষা চলছিল, সেটা এখন বুঝতে পারি। আপনারাই বিচার করবেন, পাশ করলাম কি না।
তো যা বলছিলাম, সেই সময় এক বন্ধন থেকে মুক্তির চেষ্টা চলছিল, মনের ভেতর সারাক্ষণ উথাল-পাথাল। খালি নিজেকে বলতাম, - ‘All is well, I am safe , protected and guided”.
নিজে যেটা চাইছি করতে, যেটা পারি করতে .... ঠিক করতে পারছিলাম না...
এই সময়েই, একটা ফোন আসে হিতব্রতদার কাছ থেকে। একজন ভদ্রলোক দুঃস্থ ছাত্রীদের হেলথ- হাইজিন নিয়ে কাজ করতে চান, আমার সাথে কথা বলতে চান।
যুক্ত হই ঋদ্ধির সাথে। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল, উত্তর কলকাতার মেয়েদের স্কুলগুলোয়, যেখানে দুঃস্থ ছাত্রীরা পড়তে আসে, তাদের হেলথ- হাইজিন রিলেটেড একটা সার্ভে সাথে মেধাবী ছাত্রী, যারা মাধ্যমিক পাশ করেছে, তাদের পড়াশুনার সাপোর্ট।
কাজ শুরু করি। আমার টিমে আমি একাই সেপাই 😃
উত্তর কলকাতার মেয়েদের স্কুলের নাম যোগাড় করতেই বেশ বেগ পেলাম। তারপর জয় মা কেস। বেড়িয়ে পড়লাম হাতিবাগান চত্বরে। একটা স্কুল থেকে অন্য স্কুলের রেফারেন্স। হাতিবাগান - বাগবাজার- বেলগাছিয়া- কাশিপুর- পাইকপাড়া - সিঁথি........ দিদিমণিরা সময় নিয়ে কথা বললেন। ক্রমশঃ বুঝলাম, সরকারি স্কুলে ঢুকে কাজ করার জন্য উপর মহলের অনুমোদন লাগবে।
অনেকদিন ধরে খেটে খেটে একটা স্বভাব তৈরি করেছি, কিছু করার আগে নেতিবাচক কিচ্ছু ভাবি না, যেটা চাই, সেটাই ভাবি।
চলে গেলাম কলকাতা প্রাইমারি স্কুল কাউন্সিলের চেয়ারপার্সন – শ্রীযুক্ত কার্ত্তিক মান্নার সাথে দেখা করতে। গেলেই তো আর দেখা হয় না, লিখে পাঠালাম দেখা করার কারন। এক সপ্তাহ পর আবার গেলাম, শুনলাম, আবেদন খারিজ। আমাদের প্রস্তাব আগামী বছর নিয়ে আসতে হবে।
ভাবা শুরু হল, এবার কি হবে!
এদিকে, আমার স্কুল ভিসিট চলছেই। যত ঘুরছি, তত দেখছি , খোদ এই কলকাতা শহরে আজও শিশু শ্রমিক বর্তমান, নাবালিকাদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, স্কুল থেকে, পাড়া থেকে মেয়েরা নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে, স্কুল ড্রপ-আউট তো ভয়ানক!! আরও কত কি। বাবা-মা কাজে বেড়িয়ে যাবার পর পরিবারের বড় মেয়ে (৯ বছর বয়স) ছোট ৪ ভাইবোনকে সামলায়, রান্না করে, বাসন মাজে – এগুলো ফেলে কি স্কুলে আসা যায়!
ঋদ্ধির কমিটির সাথে আলোচনায় বসলাম। ছোট ছোট টার্গেট করলাম। নতুন প্রপোসাল নিয়ে আবার গেলাম মান্নাবাবুর কাছে। এইবার তো নাছোড়বান্দা – একবার দেখা করবোই! বসে রইলাম অফিসে। মিটিং শেষে প্রায় সাড়ে ৬টা নাগাদ দেখা হল; অসম্ভব ব্যক্তিত্ব! অসাধারণ স্মৃতি এবং দুরন্ত অমায়িক ব্যবহার। সত্যি বলছি, বিশাল সরকারি অফিসে এত উঁচুতলার কোনও মানুষের সাথে আগে এভাবে কাজ নিয়ে কথা বলি নি। এই ব্যস্ত মানুষটির মনে আছে আমাদের আগের প্রপোসাল (যেটি ওনাকে মেইল করেছিলাম)। উনি শুনলেন এবারের প্রপোসাল – খুশি হলেন, বললেন – এগিয়ে যান। এরপর প্রচন্ড সাহস করে বলে ফেললাম – ‘স্যার, একটা জায়গা চাই যে, মেয়েদের নিয়ে কাজ করব, কোনও স্কুল পাওয়া যাবে কি , স্কুল ছুটির পর .....?” সঙ্গে সঙ্গে উত্তর – ‘কেন নয়! আপনি স্কুলে বলে দেখুন, হেড মিস্ট্রেসদের সাথে আমার কথা বলিয়ে দিন”। এরপর কি আর কোনও কথা থাকতে পারে ......
জয়দা আর মৌসুমির সাহায্য নিয়ে দেখা করলাম বাগবাজার অঞ্চলের কাউন্সিলরের সাথে। সেখানেও চমক – কথা বলতেই সম্মতি। বলে দিলেন – ‘খুব ভালো উদ্যোগ, আমাদের পাড়ার মহারাজা কাশিমবাজার স্কুলেই শুরু করুন’। দ্বিতীয় ধাপ পেরোলাম।
মহারাজা কাশিমবাজার স্কুলে সকালে মেয়েরা পড়ে (সাবিত্রী শিক্ষালয়) আর দুপুরে ছেলেদের স্কুল।সাবিত্রী শিক্ষালয়ের প্রধানা শিক্ষিকা খুব উৎসাহ দিলেন কাজের জন্য কিন্তু বললেন, স্কুল ব্যবহার করার জন্য ছেলেদের স্কুলের হেডটিচারের সাথে কথা বলতে হবে। দেখা হল কুমকুমদির সাথে। আবার চমক - ছেলেদের স্কুলে একজন মহিলা হেডমিস্ট্রেস !!
আমি সমসময় বলি, I am surrounded by wonderful people – and this lady has got amazing personality. প্রথম দেখেই জাস্ট কুপোকাত, মিশতে গিয়ে দেখলাম- এ যে সাক্ষাৎ সমুদ্র, কত্ত কিছু শেখার আছে! ওনার সাথে কথা বলার পর, উনি নিজেই মন্ত্রী শ্রীমতী শশী পাঁজাকে জানান আমাদের উদ্যোগের কথা এবং সম্মতিও পান।
এইবার শুরু হল ছাত্রী খোঁজা, স্থানীয় ৬টা স্কুলকে আবার ভিসিট করলাম। ৪টে স্কুল এরমধ্যে খুব সাপোর্ট করল। ছাত্রীদের সাথে ব্যাক্তিগত ভাবে আলাপ করা শুরু করলাম।
সাথে শুরু হল এইসব মানুষদের পড়াবার জন্য , না না পড়াবার নয়, গাইড করার জন্য উপযুক্ত রিসোর্স খোঁজা। সবাইকে বলতে লাগলাম, এই ফেসবুকেও আবেদন জানালাম। ৩জন এগিয়ে এলেন।
আসতে আসতে ফর্ম পেতে লাগলাম। প্রথম ফিল্ড-আপ ফর্মটা পেয়ে আনন্দে চোখে জল চলে এসেছিল।
বই-পত্র, চক-ডাস্টার, অ্যাটেন্ডেন্স রেজিস্টার কেনা হল।
অবশেষে, গতকাল , ১৮ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হল আমাদের অবৈতনিক কোচিং ক্লাস। ক্লাস এইট ও নাইনের ৩২ জন ছাত্রীকে নিয়ে .... সোম থেকে শুক্র, বিকেল ৪.৪৫ থেকে ৬.৪৫। প্রতিদিন সামান্য টিফিন আর মাসে একবার হেলথ চেকাপ (এন.আর.এসের ডাক্তাররা আসবেন)।
এদের স্বপ্ন দেখাবো, এদের আনন্দে বাঁচতে শেখাব।
সাথে থাকবেন।
গতকাল, ১৮ তারিখ আমার মায়ের জন্মদিন ছিল। এইটা আমার তরফ থেকে মা-এর উপহার।



Comments

Popular posts from this blog

‘হো’ওপনোপনো’

কথায় আছে লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো? ক্ষমা কি করা যায়, যদিও বা যায়... সেটা কি ভোলা সম্ভব? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় একটা বড় ভুমিকা নেয়, দিন যেতে যেতে ঘটনার অনুভুতির তীক্ষতা কমতে থাকে, আমরা মনে করি ‘ভুলে গেছি’; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য অনুরূপ কিছু হলে বা মনে পড়লেই দগদগে ভাব নির্লজ্জের মতন বেরিয়ে পরে।  হ্যাঁ, আমিও বলছি, ভালো থাকতে গেলে এই –“ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট” যাদুর মতন কাজ করে। একটা সত্যি ঘটনা বলি আজকে, আমার জীবনের। আমার বাড়ির পাশেই একটা কোচিং সেন্টারে আমার ছেলে পড়ত। ঘটনাক্রমে, সেন্টারহেডের ছেলেও আমার ছেলেরই ক্লাসের বন্ধু। প্রচলিত আছে, সেই সেন্টারহেড (নাম ধরে নিই ‘ক’বাবু) ভালো ছাত্রছাত্রী ছাড়া সেই সেন্টারে পড়ান না। তাই, আমার ছেলে যখন ক্লাস সেভেন (ছেলে আমার বরাবরই ৬০% পাওয়া – ছোটবেলায় লারনিং ডিসঅর্ডার ছিল) তখন তিনি তাকে যোগ্য মনে করেন নি সেই সেন্টারের। ক্লাস নাইনের সময়, আমি দেখলাম, ওর ক্লাসের অনেকজন ওই সেন্টারেই পড়ে আর বাড়ির পাশে বলে, আমারও সুবিধে হবে, অনেকগুলো পথ খরচ বেঁচে যাবে... এইসব ভেবে আবার গেলাম ‘ক’ বাবুর কাছে, অনুরোধ করলাম আমার ছেলেকে ভর্তির জন্য; বদলে ...

শিক্ষা

  একবার হয়েছে কি, ভীষণ উত্তেজনাবশতঃ বেশ কড়া দামে টিকিট কেটে দেখতে গিয়েছিলাম একটা সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। তারপর…. একঘণ্টা যেতে না যেতেই প্রান হাঁসফাঁস, হাত কামড়ানো। মনে যুদ্ধ চলছে – ‘এত খাজা ছবি কি করে হতে পারে’র সাথে ‘ঈশ, কত খরচ হয়ে গেল’র। ভাবতে ভাবতে, পকেট আরও খসিয়ে পপকর্ণ আর কোল্ড্রিঙ্কও খাওয়া হয়ে গেল। হল থেকে বেড়িয়ে কান মুলেছিলাম, এমন বোকামি আর হবে না, শপথ টপথও নিয়েছিলাম খানিক। বলুন তো, আসল বোকামিটা কোনটা ছিল? দামী টিকিট কেটে বাজে সিনেমা দেখা না কি সিনেমাটা বাজে বুঝেও, বেশি খরচ হয়ে গেছে এই ভেবে, হলে বসে নিজের সময় বরবাদ করে পুরো সিনেমাটা হজম করা? নিজেদের জীবনের দিকে একবার ভালো করে তাকাই তো; আমাদের সম্পর্কগুলোও অনেকটা এইরকম নয় কি? কাজ করছে না জেনেও, লেগে থাকি, সম্পর্কের ভার বয়ে চলি অনেক ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গেছে, লোকে কি বলবে… এইসব ভেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে যে সবচেয়ে দামী ইনভেস্টমেন্টটা পাঁকে চলে যাচ্ছে…মানে “সময়”…যেটা আর ফিরে আসবে না, তার কথা ভাবা হয়ে ওঠে না।   কিছুই কিন্তু অপূরণীয় নয়। আপনি না থাকলে, বা আমি না থাকলে সব কি থমকে যাবে? কিছুদিন আগে ইন্সটাগ্রামে একটা পোস্ট দেখে...

নিশিদিন আলোক শিখা জ্বলুক প্রাণে

  জীবনের সবকিছু আমাদের শেখায়। যাদের সাথে দেখা হয়, যাদের সাথে থাকা হয়, যাদের কথা ভাবা হয়, যা যা ঘটে  … সবার থেকে কিছু না কিছু শিখতে পারা যায়। বা, বলা ভালো- শিখতে পারতে হয়, শিখতে জানতে হয়। কারণ, শিখতে পারলে এইসবই আমাদের কাছে “অভিজ্ঞতা” যা জীবন চলতে সাহায্য করে। নতুবা, এগুলোই আমাদের যাবতীয় অ-সুখের কারণ।    তাই, আমাদের প্রতিটা মুহূর্তের ঘটে যাওয়া, ঘটতে থাকা ঘটনাগুলো, ঘটনার কুশীলব সকলেই আমাদের শিক্ষক।   এইসব শিক্ষকদের অবহেলা করবেন না। যখন আপনি মনের মতন চাকরি পাচ্ছেন না, বা যখন কোনও সম্পর্ক প্রশ্নচিহ্নের সামনে, অথবা যখন আপনার বিরুদ্ধে সব ঘটছে, আপনি সমস্যার সম্মুখীন, সেই মুহূর্তে এই শেখার পাঠ আরও বেশি করে মনে করুন। কবি তো বলেই গেছেন কতভাবে – “আরও বেদনা, আরও বেদনা, প্রভু দাও মোরে আরও চেতনা”… “চির পিপাসিত বাসনা-বেদনা, বাঁচাও তাহারে মারিয়া…” “আমি বহু বাসনাই প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে”….. গানগুলো শোনা হয়, গাওয়া হয়, কিন্তু অর্থটাই বোধগম্য হতে পারে না। সমস্যার সময়ে নিজের জীবনের শিক্ষাগুলোকে মনে করে ফেলতে পারলেই কিন্তু সেই পরীক্ষাটা সহজে পাশ করা হয়ে যাবে। যে সব অবস...