Skip to main content

পাভলভে প্রাপ্তি

 

ঋদ্ধ আমি, প্রানিত আমি ❤
পুরো ৩১শে অক্টোবর জুড়ে (এমনকি,পরের দিনেও) সবার কাছ থেকে যে পরিমান শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা পেয়েছি, মনে হচ্ছে আরও ১০০ জীবন কাটিয়ে দেওয়া যাবে। সত্যি, আমি যারপরনাই গর্বিত ।এই পরিমাণ প্রাপ্তির জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপনের যোগ্যতা অর্জন করতে অনেক অনেক অনেক সময় লাগবে।
ভাবছি এখন, সবই তো নিয়েই যাচ্ছি, দিচ্ছি কি কিছু? দিতে পারছি কি কিছু?
রমপমের সাথে সেদিন (৩১শে অক্টোবর) সকালে গিয়েছিলাম পাভলভ হাসপাতালে। আমি জানি না, আপনারা কেউ ওখানে কখনও গেছেন কি না.....
ক্যাবে আমি আর রমপম কথা বলছিলাম, মানুষ নিয়ে, জীবন নিয়ে, আমাদের অজানা জগতের পরিমাণ নিয়ে, আমাদের কত কিছু করতে না পারা নিয়ে, কত কিছু করতে পারা যায় নিয়ে।
এই যে স্কুলের ছেলে মেয়েরা গ্রামের ছবি আঁকে, মাছরাঙা আঁকে .....বেশির ভাগেরই জীবনে একবারও গ্রামে যাওয়া হয় না, মাছরাঙা দেখা হয় না। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে। আমি নিজেও পাহাড় এঁকেছিলাম যখন, পাহাড় দেখি নি।আঁকা শিখতাম মাননীয় পূর্ণেন্দু পত্রীর কাছে, সিঙ্গারার মত তেকোনা পাহাড় এঁকে খয়েরী রঙ করাতে উনি বলেছিলেন, পাহাড়ের রঙ খয়েরী হয় না তো, পাহাড়ে হরেক রঙের মেলা বসে, নীল-লাল-সবুজ-হলুদ দিয়ে আমার খাতার পাহাড় রাঙিয়ে দিয়েছিলেন উনি। অবোধ জয়তী অবাক হয়ে গিয়েছিল। অনেক পরে কেদা্র-বদ্রি ঘুরতে গিয়ে পাহাড়ে দেখেছিলাম রঙের বাহার; মনে পড়েছিল সেদিনের কথা। (পূর্ণেন্দু পত্রীর কাছে আঁকা শিখতাম বলে যেন ভাববেন না, দারুন ছবি আঁকি! গরু আঁকলে, পাশে লিখে দিতে হয় ‘এটা গরু’; এমনই শিল্পী আমি। আর, টিভিতে বিক্রম-বেতাল দেখব বলে নিয়মিত ক্লাসেও যেতাম না 🙁 )
পাভলভের সামনে এসে ক্যাব থেকে নেমে মনে হল, যেন একটা জেলখানায় ঢুকছি। উঁচু পাঁচিল, কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা।বাইরে নালাতে দেখলাম একপাতা ওষুধ বয়ে চলেছে। ঢুকে দেখি, সারি সারি দিয়ে মানুষ , কেউ বসে আছে, কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এদের সবাই প্রিয়জনকে নিয়ে বা হয়ত নিজেকেও ‘আমাদের মতন’ হবার লড়াইয়ে সামিল। ‘নরম্যাল/স্বাভাবিক’ যারা নয়, তাদের জন্য এ ঠিকানা।
রত্নাবলিদির এনজিও ‘অঞ্জলি’ কাজ করে এখানে। রমপম আর আমি অপেক্ষা করছিলাম সোহিনীর জন্য।সোহিনী আমাদের অঞ্জলির মানুষদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে, এই ছিল কথা। ফোনে সোহিনীকে পাওয়া যাচ্ছিল না, আমরাও হাঁটতে হাঁটতে ভেতরে ঢুকতে লাগলাম। হঠাত আমাদের দেখে এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন –‘আপনারাই সোহিনীর টিম?’ আলাপ হল সুব্রত বাবু আর সারিকার সাথে। বসলাম ‘চা-ঘরে’। বাঁশে ঘেরা একটা জায়গা, তার মধ্যে দুটো বাঁধানো গাছতলা আর বেতের মোড়া দিয়ে বসার আয়োজন। শুনলাম, অঞ্জলির উদ্যোগেই তৈরি হয়েছে এই চা-ঘর; যেসব মহিলাদের আর ফিরে যাওয়ার যায়গা নেই, তাদের রোজগারের উদ্দেশ্যে।মন ভোলানো আলুরদমের গন্ধর সাথে মিঠে সুরের ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ অনুভব করলাম। রান্নাঘরের দিকে চোখ গেল, দেখলাম বাহারি গয়না পরে একজন রুটি বেলতে বেলতে গান করছে, স্টেপ কাটের চুল নিয়ে একজন চা দিয়ে গেলেন। সারিকাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এদের সাজায় কে?’ সারিকা বলল, এরা এদের রোজগার থেকেই শখ পূরণ করে। দেখলাম, যারা ছিলেন, তারা সকলেই বেশ হাসিখুশি। ভালো লাগল...বেশ ভালো লাগল।
প্রশ্ন এল মনে, এত মানুষদের দেখার সময় ডাক্তারবাবুরা প্রতিজন কে কতক্ষণ করে সময় দেন?
গেলাম ‘ধোবি ঘরে’।দেখা হল একজন অত্যন্ত এম্পাওয়ার্ড মানুষের সাথে।একজন ট্রান্সজেন্ডার মানুষ ধোবিঘরের ইনচার্জ; আমাদের ঘুরে ঘুরে যত্ন করে দেখাল কি ভাবে কাজ করা হচ্ছে। ছেলেদের আর মেয়েদের শিফট আলাদা।এখানেও যারা কাজ করে, তাদেরও ঘরে ফেরার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। দেওয়ালে টাঙ্গানো উলের তৈরি একটা হাতের কাজের দিকে চোখ গেল। ঐখানের কর্মরতা একজন আবাসিক মহিলা বানিয়েছেন। কাছে গিয়ে বললাম, খুব সুন্দর হয়েছে, ঘোলাটে গলায় উত্তর এল –‘আচ্ছা’।এই ধোবিঘরও অঞ্জলির ইনিশিয়েটিভ।সারিকার সাথে কথা বলছিলাম, এই ‘আমাদের মতন নয়’ মানুষগুলি কিন্তু অনায়াসে সেই ট্রান্সজেন্ডার মহিলাটির তত্বাবধানে কাজ করে চলছে। মুগ্ধতার মাত্রা ক্রমে ক্রমে বাড়তেই চলছিল।
দেখা হল সোহিনীর সাথে। একইরকম মানসিকতার লোকজনের মেশাটা সহজ হয়ে যায়।
এরপর যাওয়া হল পুরুষ ওয়ার্ডে। বিশালাকার লোহার দরজা ধাক্কা দিয়ে খোলানো হল। দরজার বাইরে তিনজন পুলিশ বেঞ্চে বসে আর সামনের দেওয়ালে নিখোঁজ আবাসিকদের ‘সন্ধান চাই’ পোস্টার। ওয়ার্ডে ঢোকার আগে গেলাম কিচেন-গার্ডেনে। পি.ডাবলু.ডি র দাক্ষিণ্যে বিল্ডিঙের চারদিকে গজিয়ে উঠেছে ঘন আগাছার জঙ্গল। পড়ে থাকতে দেখলাম ওষুধের ভাঙ্গা শিশি।তারমধ্যেই চিলতে জমিতে কিচেন গার্ডেন, আবাসিকরা সেখানে লালশাক, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপির চাষ করে। শুনলাম আগের দিন নাকি দেড় কিলো উচ্ছে তোলা হয়েছে।
পুরুষ ওয়ার্ডের একতলা আর দোতলা সিভিয়ার পেশেন্টদের জন্য বরাদ্দ। সারিকা জানাল, এই হাসপাতালের বেড সংখ্যার দ্বিগুন মানুষ এখানে আছে। চোখে পড়ল, লোহার খাটে দুজন এঁকেবেঁকে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় অনেকগুলো চোখ অধীর বিশ্বয়ে দেখছিল আমাদের। লম্বা করিডরে সারি দেওয়া বড় বড় জানলা, শক্ত গ্রিলে বদ্ধ। একবার যেন মনে হল, খাঁচার ভেতরে কে আছে সত্যি সত্যি?
তিন তলায় পৌঁছে দেখলাম, বিশাল করিডোরের বাঁ দিকে শতরঞ্চির উপর কয়েকজন বসে পড়াশোনা করছে, সামনে খোলা খাতা, হাতে পেন। একজনের প্যান্টের পকেটে ঢোকানো একটা মগ, আরেকজনকে দেখলাম বুকপকেটে একটা গ্লাস নিয়ে ..... মাস্টার মশাই সাদা বোর্ডে একটা করে ইংরেজি সেন্টেন্স লিখছেন আর সবাইকে মানে জিজ্ঞেস করছেন। অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিলাম সকলের চেষ্টাগুলোকে ... দেখছিলাম খাতার লেখাগুলো....আমরা চারজন, এরমধ্যে দুজন নতুন মানুষ তাদের মধ্যে উপস্থিত, আমাদের উপস্থিতি তাদের একটুও প্রভাবিত করছে না। অত্যন্ত মনঃসংযোগ নিয়ে সকলেই মাস্টার মশাইয়ের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলছে। মাস্টার মশাই একজন করে নাম ধরে ডেকে উত্তর চাইছেন, পাচ্ছেনও। আমরা কি পারতাম, আমরা কি পারি এভাবে থাকতে? আমি জানি না, আমি সত্যি জানি না, এভাবে নিরুত্তাপ থাকা ভালো না মন্দ।
সুব্রত বাবু এদের আঁকা শেখান, সেরামিক দিয়ে, এম-সিল দিয়ে হাতের কাজ শেখান।ক্লাসের পাশে বেতের মোড়ায় বসে দেখছিলাম ওদের আঁকা ছবি দিয়ে তৈরি অঞ্জলির গ্রিটিংস কার্ড। আঁকা বুঝি না, শৈল্পিক ধারণা এক্কেবারে তলানিতে, তাও অবাক হচ্ছিলাম, টুকরো কাগজে রঙের আঁকিবুঁকি দেখে। একটা জিনিষ খেয়াল করলাম, কম-বেশি সবাই ‘জিভ বের করা কালী এঁকেছে’; বিশ্লেষণ করলে তো কতকিছুই উঠে আসবে। সুব্রত বাবু আমাদের সামনে একজন মানুষকে জিজ্ঞেস করলেন – ‘আপনি কেন কালীকে আঁকেন’?চশমা চোখের মানুষটি প্রবীণ, জরানো ভাষায় বললেন-‘মা কালী ধ্বংস থেকে রক্ষা করেন, তাই”। চোখের জল গাল বেয়ে পড়ল হাতের তালুতে, বুঝতে পারছিলাম, আমি আস্তে আস্তে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছি। সুব্রত বাবু দেখালেন কয়েকটা ছবি, যেখানে এনাদের বিষয় দেওয়া হয়েছিল –‘ভালোবাসা’। অনেকেই দুটি পুরুষ-নারী এঁকেছে, কেউ আমার হার্ট সাইন দিয়ে কায়দা করেছে, একজন এঁকেছে দুটো পাখি, একটা ঠোঁট! ভাবা যাচ্ছে .... ?যে ছেলেটি এটা এঁকেছে, আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, দেখে বোঝা অসাধ্য যে মানুষটি ‘আমাদের মতন নয়’; কিন্তু এদের বাড়ি নেই, মা নেই বাবা নেই ভাই নেই বোন নেই বন্ধু নেই প্রেমিকা নেই, স্ত্রী নেই সন্তান নেই,থেকেও নেই। আমাদের দেশে গায়ে ‘পাগল’এর তকমা লেগে গেলে দেশবাসী হবার অধিকারটাও যে থাকে না।
নিজের সম্মন্ধে বলতে গেলে আমি শুরুতেই বলি –‘আমি একজন লাইফ এন্থুজিয়াস্ট, ইসিলি অ্যামিউসড’, তাই বোধ হয় জীবন আমায় বারে বারে এমন করে চমকায়। গলার নালিতে একটা জমাট কান্না গুমরাচ্ছিল।
সারিকা আমাদের একটা অন্য ঘরে নিয়ে এল। সামনে রাখল একটা বিশাল ক্যানভাস। সেখানে যে ছবিটা ছিল, আমি চেষ্টা করছি বর্ণনা দেবার। আগুনরঙা ব্যাকগ্রাউন্ড; সামনে দুজন নগ্ন নারী, রক্তাক্ত জিভ বের করে আছে, নীচে কালো কালো হাত, একটা হাত একজন নারীর যোনি স্পর্শ করছে, সারা ছবি জুড়ে কালো কালো খোপ করা। ছবিটা দেখেই ভীষণ ভয় পেলাম। জিজ্ঞেস করলাম সারিকাকে, কে বানিয়েছে? শুনলাম তিনজন আবাসিক একসাথে এটা তৈরি করেছে। তাদের শোনানো হয়েছিল একটা ঘটনা – একটা মানসিক হাসপাতালে ৮ জন মহিলা শেকল বাঁধা অবস্থায় পুড়ে মারা গিয়েছিল। সেই গল্প শুনে এই ছবি তৈরি। টিমস্পিরিট বলে একটা বিষয় আছে না? কি যেন সেটা? সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল ..... ভয়, বিশাদ, লজ্জা, হিংসা, প্রতিশোধ.... ভেতরের কালোগুলোকে বের করা যায় কি ভাবে? কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায় কুরে কুরে খাওয়া চিন্তাগুলো থেকে?? কি ভাবে ?
সেরামিকের কর্মশালায় গিয়ে একটু হাল্কা লাগল। সেই ছোট্ট বেলায় আটামাখা দিয়ে পুতুল বানাতাম, মনে আছে? অনেকদিন পর সেই পুতুল দেখলাম, মাছ দেখলাম, গণ্ডার দেখলাম, অনেক রকম সাইজের প্লেট দেখলাম।
গেলাম, ব্লকপ্রিন্ট সেকশানে। সেই করিডোরেরই আরেক প্রান্তে। ইংরেজি মাস্টারমশাই কৌশিক এখানকার ইনচার্জ; সপ্তাহে চারদিন এই ব্লকপ্রিন্টের কাজ শেখানো হয়। শতরঞ্চি থেকে উঠে এসে কয়েকজন অতি উৎসাহে তাদের তৈরি হাতের কাজ দেখাতে থাকল।অ্যাপ্রিসিয়েশান সবাই চায়, সবার ভালো লাগে, এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, আরও ভালো কিছু করার ইচ্ছে জাগায়। শুনলাম অঞ্জলি থেকে অনলাইনে এইসব হাতের কাজের মার্কেটিং শুরু হবে। শুনলাম, কৌশিক বাবু এখানকারই একজন প্রাক্তন আবাসিক। চমকে গেলাম আবারও।
নীচে নামার সময় দোতলায় থামতে হল। গ্রিল থেকে হাত বের করে একজন সারিকাকে ডেকে বলল - ম্যাডাম, আমাদের আবার সিনেমা দেখাবেন কবে? গুপি গাইন-বাঘা বাইন দেখান না। আরেকজন জিজ্ঞেস করল, কটা বাজে। আমাদের নাম জিজ্ঞেস করা হল, উত্তর দিলাম। জানাতে হল আমি ঘটি না বাঙাল। খাটে বসে পা নাচাতে নাচাতে একজন গেয়ে উঠল - "উয়ো মুকাদ্দার কা সিকান্দার ক্যাহেলায়েগা"....
সময় হয়ে এসেছিল, মহিলা ওয়ার্ডে আর যাওয়া হল না। সারিকা আর সুব্রত বাবুকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বেরলাম আমরা। আমি আর রমপম, কোনও কথা বলার অবস্থায় ছিলাম না।কয়েক মিনিট সময় নিলাম। ক্যাব বুক করলাম।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে ক্যাবে আমি আর রমপম কথা বলছিলাম, মানুষ নিয়ে, জীবন নিয়ে, আমাদের অজানা জগতের পরিমাণ নিয়ে, আমাদের কত কিছু করতে না পারা নিয়ে, কত কিছু করতে পারা যায় নিয়ে।
(একটাও ছবি তোলা হয় নি, মনেও পড়ে নি যে তুলতে হবে)
আচ্ছা, পাগল বা পাগলি সম্বোধনটা যদি আদর করে মাথায় হাত দিয়ে, কপালে চুমু খেয়েই শুধু ব্যাবহার হয় ...... ??
এই বছর, ৩০শে অক্টোবর দেহদান করলাম। টেম্পোরারি ডোনার কার্ড পেয়ে গেছি।

Comments

Popular posts from this blog

‘হো’ওপনোপনো’

কথায় আছে লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো? ক্ষমা কি করা যায়, যদিও বা যায়... সেটা কি ভোলা সম্ভব? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় একটা বড় ভুমিকা নেয়, দিন যেতে যেতে ঘটনার অনুভুতির তীক্ষতা কমতে থাকে, আমরা মনে করি ‘ভুলে গেছি’; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য অনুরূপ কিছু হলে বা মনে পড়লেই দগদগে ভাব নির্লজ্জের মতন বেরিয়ে পরে।  হ্যাঁ, আমিও বলছি, ভালো থাকতে গেলে এই –“ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট” যাদুর মতন কাজ করে। একটা সত্যি ঘটনা বলি আজকে, আমার জীবনের। আমার বাড়ির পাশেই একটা কোচিং সেন্টারে আমার ছেলে পড়ত। ঘটনাক্রমে, সেন্টারহেডের ছেলেও আমার ছেলেরই ক্লাসের বন্ধু। প্রচলিত আছে, সেই সেন্টারহেড (নাম ধরে নিই ‘ক’বাবু) ভালো ছাত্রছাত্রী ছাড়া সেই সেন্টারে পড়ান না। তাই, আমার ছেলে যখন ক্লাস সেভেন (ছেলে আমার বরাবরই ৬০% পাওয়া – ছোটবেলায় লারনিং ডিসঅর্ডার ছিল) তখন তিনি তাকে যোগ্য মনে করেন নি সেই সেন্টারের। ক্লাস নাইনের সময়, আমি দেখলাম, ওর ক্লাসের অনেকজন ওই সেন্টারেই পড়ে আর বাড়ির পাশে বলে, আমারও সুবিধে হবে, অনেকগুলো পথ খরচ বেঁচে যাবে... এইসব ভেবে আবার গেলাম ‘ক’ বাবুর কাছে, অনুরোধ করলাম আমার ছেলেকে ভর্তির জন্য; বদলে ...

শিক্ষা

  একবার হয়েছে কি, ভীষণ উত্তেজনাবশতঃ বেশ কড়া দামে টিকিট কেটে দেখতে গিয়েছিলাম একটা সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। তারপর…. একঘণ্টা যেতে না যেতেই প্রান হাঁসফাঁস, হাত কামড়ানো। মনে যুদ্ধ চলছে – ‘এত খাজা ছবি কি করে হতে পারে’র সাথে ‘ঈশ, কত খরচ হয়ে গেল’র। ভাবতে ভাবতে, পকেট আরও খসিয়ে পপকর্ণ আর কোল্ড্রিঙ্কও খাওয়া হয়ে গেল। হল থেকে বেড়িয়ে কান মুলেছিলাম, এমন বোকামি আর হবে না, শপথ টপথও নিয়েছিলাম খানিক। বলুন তো, আসল বোকামিটা কোনটা ছিল? দামী টিকিট কেটে বাজে সিনেমা দেখা না কি সিনেমাটা বাজে বুঝেও, বেশি খরচ হয়ে গেছে এই ভেবে, হলে বসে নিজের সময় বরবাদ করে পুরো সিনেমাটা হজম করা? নিজেদের জীবনের দিকে একবার ভালো করে তাকাই তো; আমাদের সম্পর্কগুলোও অনেকটা এইরকম নয় কি? কাজ করছে না জেনেও, লেগে থাকি, সম্পর্কের ভার বয়ে চলি অনেক ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গেছে, লোকে কি বলবে… এইসব ভেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে যে সবচেয়ে দামী ইনভেস্টমেন্টটা পাঁকে চলে যাচ্ছে…মানে “সময়”…যেটা আর ফিরে আসবে না, তার কথা ভাবা হয়ে ওঠে না।   কিছুই কিন্তু অপূরণীয় নয়। আপনি না থাকলে, বা আমি না থাকলে সব কি থমকে যাবে? কিছুদিন আগে ইন্সটাগ্রামে একটা পোস্ট দেখে...

নিশিদিন আলোক শিখা জ্বলুক প্রাণে

  জীবনের সবকিছু আমাদের শেখায়। যাদের সাথে দেখা হয়, যাদের সাথে থাকা হয়, যাদের কথা ভাবা হয়, যা যা ঘটে  … সবার থেকে কিছু না কিছু শিখতে পারা যায়। বা, বলা ভালো- শিখতে পারতে হয়, শিখতে জানতে হয়। কারণ, শিখতে পারলে এইসবই আমাদের কাছে “অভিজ্ঞতা” যা জীবন চলতে সাহায্য করে। নতুবা, এগুলোই আমাদের যাবতীয় অ-সুখের কারণ।    তাই, আমাদের প্রতিটা মুহূর্তের ঘটে যাওয়া, ঘটতে থাকা ঘটনাগুলো, ঘটনার কুশীলব সকলেই আমাদের শিক্ষক।   এইসব শিক্ষকদের অবহেলা করবেন না। যখন আপনি মনের মতন চাকরি পাচ্ছেন না, বা যখন কোনও সম্পর্ক প্রশ্নচিহ্নের সামনে, অথবা যখন আপনার বিরুদ্ধে সব ঘটছে, আপনি সমস্যার সম্মুখীন, সেই মুহূর্তে এই শেখার পাঠ আরও বেশি করে মনে করুন। কবি তো বলেই গেছেন কতভাবে – “আরও বেদনা, আরও বেদনা, প্রভু দাও মোরে আরও চেতনা”… “চির পিপাসিত বাসনা-বেদনা, বাঁচাও তাহারে মারিয়া…” “আমি বহু বাসনাই প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে”….. গানগুলো শোনা হয়, গাওয়া হয়, কিন্তু অর্থটাই বোধগম্য হতে পারে না। সমস্যার সময়ে নিজের জীবনের শিক্ষাগুলোকে মনে করে ফেলতে পারলেই কিন্তু সেই পরীক্ষাটা সহজে পাশ করা হয়ে যাবে। যে সব অবস...