Skip to main content

এক ছিঃস্যকর হাস্যকর মা এর কথা

 


আজ্ঞে হ্যাঁ! এই আমার পরিচয়; আমার একমাত্র পুত্র এইভাবেই আমায় সম্বোধন করে থাকে।

যখন বলেছি - ভুঁড়িটা বাড়ছে, এরপর বান্ধবীর সাথে টেকনিক্যালি অসুবিধা হবে, বা, যখন বলি, আমি রেগে গেছি – যা তা বলতে পারি, কিছু মনে করা চলবে না, কারণ আমার পিরিয়ড হয়েছে......বা ক্লাস নাইনে যখন বলেছিলাম রিপ্রোডাক্টিভ সিস্টেমটা আমিই তোকে পড়াব; “ছিঃস্যকর” তকমাটা এইসবের জন্য।

আর, জন্ম থেকেই না কি সে একজন হাস্যকর বাচ্চা মা কে দেখে আসছে। গতকাল পেট ব্যথায় কাবু ছিলাম; বলে দিল – আমার বেরোবার সময় আসছে, এইটা নরম্যাল। জাস্ট সি!!

সেভাবে, সকলের মতন, ‘মা’ হতে পারি নি – ঠিকমতন সময় করে পড়াতে বসাতে পারি নি, কোনও দিনই স্কুলের হোমওয়ার্ক নিয়ে চিন্তা করি নি। স্কুলের সব টিচারকেই চিনতাম না। মনে আছে, তাতান বোধয় তখন ক্লাস ফাইভ। টিচার ডেকে বলল, ও ক্লাসে কিছুই লেখে না, বাড়িতে আরও যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। আমি সে মহিলাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম –আমার ছেলের মতন কতজন ক্লাসে আছে? উত্তর ছিল। একজনও না। তাই ওনাকে বলেছিলাম – তাহলে, আমার ছেলের উপর স্কুলেই একটু বেশি যত্ন নেওয়া হোক। ফলস্বরুপ, এরপর আমাকে আর কখনও স্কুলে ডাকা হয় নি। আমি পারি নি – পারি না ছেলেকে সেভাবে সময় দিতে, কাজের সুত্রে ওর পরীক্ষা চলাকালীন বিভিন্ন সময়ে আমায় বাইরে থাকতে হয়েছে। তাই, অভ্যেস করে নিয়েছি.... ওকে আর জিজ্ঞেস করি না পরীক্ষার পর যে ‘কেমন হল’? বদলে জানতে চাই, ‘পরীক্ষা দিয়ে কেমন লাগল’!!
ছোটবেলা থেকেই বাংলা আর অঙ্কে সে লাল দাগ পায়। ওকে শিখিয়েছি; লাল রঙ তো জেতার রঙ! যুদ্ধে যাবার আগে, লাল টিকা পড়ায় যে! তাতান হয়তো তাই পড়াশোনাকে ভয় পায় না। সবাই বলবে এইটা খারাপ....আমি ভাবি, ভয় পেলে কি জেতা যায়?

ছেলে আমার কোনোদিন ড্রইং ভালবাসল না, কারণ সেখানেও খাতা-পেন্সিল নিয়ে বসতে হয়। কি করি, তাতান যে পড়তে ভালোই বাসে না।

এই তাতান কিন্তু স্কুল থেকে বরাবর ব্যবহারের জন্য মেরিট কার্ড পেয়ে এসেছে। প্রচুর বন্ধু ওর। দারুন দারুন সব বন্ধু। আজ তো দেখলাম, ওর সব বন্ধু ওর সাথে নিজেদের ছবি দিয়ে ওয়াটসঅ্যাপ স্টেসাস দিয়েছে।একজন তো আবার দশদিন আগে থেকে কাউন্টডাউনও করছিল।
একটা ঘটনা খুব বলতে ইচ্ছে করছে। একদিন তাতানের স্কুলের এক বন্ধুর মা, কোথাও থেকে আমার ফোন নম্বর যোগাড় করে ফোন করেছিলেন – আমায় কেঁদে কেঁদে বললেন; তার ছেলে সব সেকশান থেকে কমপ্লেন পেয়ে এখন তাতানের সেকশনে এসেছে আর তাতানের পাশেই বসে। একমাত্র তাতানই এমন স্টুডেন্ট যে এখনও অব্দি ওর নামে নালিশ করে নি। উনি সেদিন ফোনে অনেক আশীর্বাদ দিয়েছিলেন।

বাবু এখন ক্লাস টুয়েলভের সিলেবাসের বদলে রাস্তাঘাটে ফটোগ্রাফির সাবজেক্ট খুঁজে বেড়ান।

ইদানীং বড্ড বেশি ফোনটা নিয়ে থাকে এবং এই পয়েন্টেই আমার সাথে ওর সম্পর্কের অবনতি। আজকাল, কথা বন্ধ হলে, দুজনেই মচকাই না। ভাববাচ্যে কথা হয়। বিরক্তি এলেই মনে করার চেষ্টা করি, বয়ঃসন্ধির উপসর্গ, মাঝে মধ্যে সব ভুলেও ‘অশান্তি’ হয়েই যায়। তখন ভাববাচ্যেই আওয়াজ আসে – ‘আমাদের বাড়িতে নাকি একজন কাউন্সিলর আছে!’ ব্যস, বেলুন ফুউউউউস!!
বাড়ির বাজার করা, ফাইফরমাসের সাথে নিয়ম করে পা-টেপাতে মিনমিনে আপত্তি থাকলেও সে করে ফেলে। বদলে, তাকে স্কুল থেকে আসার পর চিতশোয়া অবস্থায় মোজা খুলে দিতে হয়, জিনিষপত্র খুঁজে দিতে হয়, ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে দিয়ে হয়.... এই যা।

ছেলে আমার গান শোনে – ওর সাথে থাকতে থাকতেই নিজেকে ডেস্প্যাসীতো, এলান ওয়াকার, গ্রিন ডে, ইমাজিন ড্র্যাগন নিয়ে শিক্ষিত করে তুলছি। কোক স্টুডিওতে ভিশাল ডাদলানি শুনতে শুনতে ড্রেস চেঞ্জ করে সে। যারপরনাই মিউসিক্যাল প্রেসেন্স। রিসেন্ট দেখছি, কিশোর কুমারের লাভ সংসগুলও পছন্দ হচ্ছে....বয়স, সব বয়সের গল্প। বেরোবার সময় আয়নার সামনে এদিক বেঁকে, ওদিক বেঁকে নিজেকে দেখা, তিন-চার রকমের ডিও মাখা – হোতা হ্যায়, হোতা হ্যায়!! বললে হবে, আজ তার সতের বছর হল!

অনেক দিন গেছে, কিছু চেয়েছে যখন, দিতে পারি নি, সময় লেগেছে দিতে। এমন দিনও কেটেছে, অফিস যাবার সময়, নিজের জন্মদিনের জমানো টাকা থেকে আমায় দিয়ে বলেছে, সাবধানে যেও।রোজ স্কুল যায় গোনাগুনতি পয়সা নিয়ে। আজ পর্যন্ত আমায় না জানিয়ে কখনও কোনও খরচ করে নি।
বড্ড বেশি গায়ে লেগে থাকে। ছোটবেলায় সকালে চোখ খুলেই তার ইঞ্জিন হতে হত। আমার কোমর ধরে দাঁড়াত, আমি কু ঝিকঝিক বলতে বলতে তাকে বেসিনের কাছে নিয়ে যেতাম, সে ব্রাশ করত। এই আ্যটাচমেন্টটাই এবার কমাতে হবে।

ছোট্ট একটা কাজের শুরু হয়েছে, বন্ধুর সাথে। সেখানে তাতানকে নিয়ে গেছি। অফিসে বসে সে এরমধ্যে কাজও করে ফেলেছে।

একটা কথা জোর গলায় এখন বলতে পারি যে, আমি নিশ্চিন্ত; কাল যদি আমি না থাকি..... তাতান পেরে যাবে।



Comments

Popular posts from this blog

‘হো’ওপনোপনো’

কথায় আছে লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো? ক্ষমা কি করা যায়, যদিও বা যায়... সেটা কি ভোলা সম্ভব? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় একটা বড় ভুমিকা নেয়, দিন যেতে যেতে ঘটনার অনুভুতির তীক্ষতা কমতে থাকে, আমরা মনে করি ‘ভুলে গেছি’; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য অনুরূপ কিছু হলে বা মনে পড়লেই দগদগে ভাব নির্লজ্জের মতন বেরিয়ে পরে।  হ্যাঁ, আমিও বলছি, ভালো থাকতে গেলে এই –“ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট” যাদুর মতন কাজ করে। একটা সত্যি ঘটনা বলি আজকে, আমার জীবনের। আমার বাড়ির পাশেই একটা কোচিং সেন্টারে আমার ছেলে পড়ত। ঘটনাক্রমে, সেন্টারহেডের ছেলেও আমার ছেলেরই ক্লাসের বন্ধু। প্রচলিত আছে, সেই সেন্টারহেড (নাম ধরে নিই ‘ক’বাবু) ভালো ছাত্রছাত্রী ছাড়া সেই সেন্টারে পড়ান না। তাই, আমার ছেলে যখন ক্লাস সেভেন (ছেলে আমার বরাবরই ৬০% পাওয়া – ছোটবেলায় লারনিং ডিসঅর্ডার ছিল) তখন তিনি তাকে যোগ্য মনে করেন নি সেই সেন্টারের। ক্লাস নাইনের সময়, আমি দেখলাম, ওর ক্লাসের অনেকজন ওই সেন্টারেই পড়ে আর বাড়ির পাশে বলে, আমারও সুবিধে হবে, অনেকগুলো পথ খরচ বেঁচে যাবে... এইসব ভেবে আবার গেলাম ‘ক’ বাবুর কাছে, অনুরোধ করলাম আমার ছেলেকে ভর্তির জন্য; বদলে ...

শিক্ষা

  একবার হয়েছে কি, ভীষণ উত্তেজনাবশতঃ বেশ কড়া দামে টিকিট কেটে দেখতে গিয়েছিলাম একটা সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। তারপর…. একঘণ্টা যেতে না যেতেই প্রান হাঁসফাঁস, হাত কামড়ানো। মনে যুদ্ধ চলছে – ‘এত খাজা ছবি কি করে হতে পারে’র সাথে ‘ঈশ, কত খরচ হয়ে গেল’র। ভাবতে ভাবতে, পকেট আরও খসিয়ে পপকর্ণ আর কোল্ড্রিঙ্কও খাওয়া হয়ে গেল। হল থেকে বেড়িয়ে কান মুলেছিলাম, এমন বোকামি আর হবে না, শপথ টপথও নিয়েছিলাম খানিক। বলুন তো, আসল বোকামিটা কোনটা ছিল? দামী টিকিট কেটে বাজে সিনেমা দেখা না কি সিনেমাটা বাজে বুঝেও, বেশি খরচ হয়ে গেছে এই ভেবে, হলে বসে নিজের সময় বরবাদ করে পুরো সিনেমাটা হজম করা? নিজেদের জীবনের দিকে একবার ভালো করে তাকাই তো; আমাদের সম্পর্কগুলোও অনেকটা এইরকম নয় কি? কাজ করছে না জেনেও, লেগে থাকি, সম্পর্কের ভার বয়ে চলি অনেক ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গেছে, লোকে কি বলবে… এইসব ভেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে যে সবচেয়ে দামী ইনভেস্টমেন্টটা পাঁকে চলে যাচ্ছে…মানে “সময়”…যেটা আর ফিরে আসবে না, তার কথা ভাবা হয়ে ওঠে না।   কিছুই কিন্তু অপূরণীয় নয়। আপনি না থাকলে, বা আমি না থাকলে সব কি থমকে যাবে? কিছুদিন আগে ইন্সটাগ্রামে একটা পোস্ট দেখে...

হাল্লা চলেছে যুদ্ধে!!

  শুন্ডির রাজা আজও অচেতন, হাল্লা চলেছে যুদ্ধে, আর আমরা ঘুমাই প্রতিক্রিয়ায়; স্বপক্ষে - বিরুদ্ধে। সকাল থেকে উঠে সারাদিন, তারপর সারারাত... কে কি ভাবছে, বলছে -করছে ভেবে যাই সাতপাঁচ। পুঁজি জমছে ব্যাঙ্কে আর সুগার-প্রেসার ঘরে; লাগামহীন অ্যাড্রিনালীন সর্বত্র ছিটকে পরে। মনখুলে আজ হাসতে গেলে ভরসা লাফিং ক্লাব, নিজেকে হারিয়ে ফেলার খেলায় মেতেছি আমরা সব। গুপী গাইন – বাঘা বাইন সিনেমা দেখে নি, এমন কেউ আছে কি? সিনেমার একটা গানের লাইন ‘হেডিং’ দিলাম লেখায় আর, শুরু করার সময় অনুরোধ রাখছি, আরেকটা গান মনে করার... “এক যে ছিল রাজা, তার ভারি দুখ”। এই গানটায় তিনটে প্রশ্ন করা হয়েছে– দুঃখ কীসে হয়, দুঃখ যাবে কি আর দুঃখ কীসে যায়। এবং উত্তরও দেওয়া হয়েছে (গানটা মনে করুন, নতুবা শুনে ফেলুন আরেকবার)। তো, আমি কেনই বা আজ এই কাজ করাচ্ছি আপনাদের দিয়ে, জানতে চাইবেন নিশ্চয়ই।   আরেকটা সিনেমার প্রসঙ্গ টেনে মুল কথায় আসার চেষ্টা করছি। কয়েকবছর আগে আমির খানের একটা ছবি এসেছিল, অ্যাডাল্ট ফিল্ম – ‘তারে জমীন পর’, হয়তো দেখে থাকবেন। অ্যাডাল্ট বললাম, কারণ, আমি সর্বতঃ ভাবে বিশ্বাস করি, সিনেমাটির মাধ্যমে যে ম্য...