জীবন সমুদ্রের মতন, ফিরিয়ে দেয়; না শেষ হওয়াগুলোকে শেষ করার সুযোগ দেয়।
ক্লাস ফোর পর্যন্ত ব্রাক্ষ গার্লস এ পড়েছি। রমাদি ছাড়া কাউকেই মনে নেই। মনে আছে, স্কুল ফাংশানে একবার মেইন রোল পেয়েছিলাম, একলব্য সেজেছিলাম, আর একবার সাঁওতালি নাচের পর খুব পছন্দের কানের দুল এক বন্ধুর ভালো লেগেছিল বলে তাকে দিয়ে দিয়েছিলাম। স্টীলের স্যুটকেস নিয়ে স্কুল যেতাম। মনে আছে ক্লাসে শিশুর কবিতাগুলো মুখস্থ বলতে খুব ভালো লাগতো। ফেবলস ক্লাসে আমায় ডাকা হয় সামনে দাঁড়িয়ে রিডিং পড়তে (পড়তে হয়তো ভালো পারতাম, তবে মনে পড়ছে ভীষন কথা বলতাম বলে এইটা শাস্তি হিসেবে করানো হত)। খুব মনে পড়ে স্কুলবাস এ যাওয়া। সকালে প্রায় রোজ লেট। অদ্ভুত সময়ে পটি পেত। মায়াধরদা ছুটে গিয়ে বাস দাঁড় করাত, আমি বাসে উঠে জুতো বাঁধতাম। ফেরার সময় বাস থেকে নেমেই দেখতাম বাড়ির ঝুলবারান্দায় দাদু-ঠাম্মা দাঁড়িয়ে আছেন। ছুটির পর খেলতে খেলতে একবার বাস মিস করেছিলাম। ব্যাস!! সে যে কি কান্ড! তারপর থেকে অনেকদিন বাবা ছুটির সময় অফিস থেকে আমার স্কুলে এসে আমায় বাসে তুলে আবার অফিস ফিরত। শ্যামবাজারে থাকার সময় ছোটবাসে যেতাম। সল্টলেক থেকে শুরু হল, বড় বাস। চন্ডী কাকু আমায় প্রথম তুলত। তাই আমার হাতেই ছিল বাসের সবচেয়ে ভালো সিট নেওয়ার ক্ষমতা; খুব শিগগিরই বিখ্যাত হয়ে গেলাম বড় দিদিদের কাছে। এক একজনকে একেকদিন বসতে দিতাম বেস্ট সিটে। বদলে মিলত হজমী বা কাশ্মীরি কুল - না চেয়েই পেতাম। সত্যি বলছি। আমার কাছে বড় ক্লাসের দিদিদের সাথে মেলামেশাটা ভালো লাগত। নতুবা তো কেউ পাত্তাই দেয় না ছোটদের।
স্কুলের বকুল গাছ, শিউলি গাছ, রঙ্গন ফুল আর মেহেন্দিপাতা ঘেরা মাঠ সবচেয়ে ফেভারিট ছিল। একবার পরীক্ষা দিতে গিয়ে, রচনা না লিখে খাতা জমা দিয়ে চলে এসেছিলাম। কেন জান? দোতলার জানলা দিয়ে দেখলাম বন্ধুরা নিচের মাঠে খেলছিল পরীক্ষা শেষ করে, আমার মনে হয়েছিল রচনাটা পরেও লেখা যাবে, কিন্তু আমি না গেলে আমার দল চু কিতকিতে হেরেই যাবে। তাই, সেটা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট।
ক্লাস ফোর এ অ্যানুয়াল স্পোর্টস এর হিটের দিন ব্যাকরেস করতে গিয়ে আমার ট্র্যাকে রেশমী এসে যায়, দুজনে পা জড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। বাঁ হাতে প্রচন্ড চোট লাগে। সকালে ব্যথা পাবার পর, বিকেলে বাড়ি ফিরি। হাতটা ভেঙে গিয়েছিল। বাবা সেদিনের পর আর স্কুলে পাঠায় নি।
এত বছর বাদে, আবার জীবন আমায় নিয়ে গেল ব্রাক্ষ গার্লস এ। এবারে আমার পরীক্ষা র সিট পড়েছে এই স্কুলে। বড় লোহার দরজা পেরিয়ে মাঠটায় ঢুকতেই সারা গায়ে কাঁটা দিল। চোখে জল এসে গিয়েছিল। সবকিছু বড্ড চেনা। সেই বকুল গাছ, শিউলি গাছ আজও আছে। হয়তো আমাকেও চিনতে পারছে। আবার চমক! বসতে হল সেই ক্লাস- সেই জানলার পাসের সীট- যেখান থেকে বন্ধুদের খেলতে দেখেছিলাম। মনে পড়ে গেল কত নাম - রঞ্জিতা, দেবলীনা, অদিতি......


Comments
Post a Comment