টুপাই একদম
ফ্যামিলি গেট-টুগেদার পছন্দই করে না, বড় পরিবার – একসাথে সবার সাথে থাকা তার ভীষণ
অপছন্দের। নিজের বাড়ির ছোট পরিসর, বাবা-মা-বোনের সাথে ও অনেক কমফোর্টেবল। বন্ধুদের
সাথে হইচইতে কোনও আপত্তি নেই। বাবা-মা র অফিস পিকনিকও ভালো লাগে। কিন্তু ওই –
আত্মীয়স্বজনের সাথে থাকাতেই তার ভীষণ বিরোধ। মনিকা – অনিরুদ্ধ নিজেদেরই দোষ দেয়
ছেলের এই আচরণের জন্য। বয়ঃসন্ধির সময়, গলার আওয়াজ বেড়েছে, মেজাজ বেড়েছে – ছেলেকে সামলে
চলতে হয়।
সামনের সপ্তাহে
জ্যাঠতুতো দিদির বিয়ে; মা-বাবা অনেক করে বলেছে যেতে। একদম ইচ্ছে নেই টুপাইএর। দিন
যত এগিয়ে আসছে, তত ফন্দি কষছে, কি ভাবে না যাওয়া যায়। ইন্টার-স্কুল ম্যাচটাই এখন
বড় ভরসা।
সবাই যখন প্যাকিং
করছে বিয়েবাড়ি যাবার জন্য, মায়ের কাছে গিয়ে সে বলে, এই রবিবারে বড় ফুটবল ম্যাচ
আছে, ওর পক্ষে যাওয়া অসম্ভব। অলরেডি মিডফিল্ডার হিসেবে বেশ নাম করে গেছে টুপাই; মনিকা
আর অনিরুদ্ধ আলোচনায় বসে; ছেলে মুখ গোমড়া হয়ে থাকলে, সারা বিয়েবাড়ি তাদের অনেক
সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে আবার টুপাইকে একা রেখেও তারা কখনো কোথাও যায় নি।এছাড়া,
ফুটবল ম্যাচেও টুপাইকে থাকতেই হবে। সব ভেবে, তারা ঠিক করে, বিয়ে কাটিয়েই বৌভাতের
দুপুরে রওনা হয়ে চলে আসবে।
টুপাইএর খুব মজা।
এই প্রথম পুরো বাড়িতে একা। মা কাজের মাসিকে বলে গেছে বেশিক্ষন থাকতে, পাশের বাড়ির
সেন কাকুদের কাছে রাতে থাকবে সে। মা-বাবা বেড়িয়ে যেতেই বন্ধুদের ফোন করে খেলতে
আসতে বলে। কিন্তু কেউই বাড়িতে খেলতে রাজি নয়। সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পরে টুপাই, বন্ধুদের
নিয়ে বার্গার খাবার প্ল্যান হয়েছে।
ফুরফুরে মেজাজে,
সাইকেল রেস শুরু হয় – রেসে যে জিতবে, তার বার্গার ফ্রি; বন্ধুরা সবাই স্পন্সর
করবে। ক্যাফে থেকে জাস্ট দশ হাত আগে এসেই ঋজু সাইকেল নিয়ে গায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে
পড়ল। টুপাই এর উপর নিজের সাইকেল, তার উপরে সাইকেল নিয়ে ঋজু – অসম্ভব ব্যাথা !
চোখ খুলে টুপাই
দেখে, সে হাসপাতালে। দুটো পা-ই ভেঙেছে। সেন কাকু পাশে বসে; কাকু জানায়, মা-বাবা
বিয়েবাড়ি ছেড়ে চলে আসছে। টুপাই অনুরোধ করে, কাকু যেন বাবাকে সাইকেল রেস নিয়ে কিছু
না বলে। মনে মনে প্রমাদ গুনতে থাকে – কি প্রচণ্ড বকুনি জমে আছে তার জন্য।
বাবা আজ বাজার
থেকে একসঙ্গে পাঁচটা কমিক্স নিয়ে এসেছে তার জন্য; মা , ও যা খেতে ভালবাসে, তাই
বানিয়ে দিচ্ছে, বোন তো যখনই একটু ব্যাথা হচ্ছে, হাত বুলিয়ে দিচ্ছে – সারাক্ষন পাশে
বসে টুপাইএর সাথে গল্প করে যাচ্ছে। গতকাল ঠাম্মা-দাদুও চলে এসেছে। টুপাইকে
বাবা-কাকা-জ্যাঠাদের ছোটবেলার দুষ্টুমির গল্প শোনাচ্ছে।
বিয়েবাড়ির পাট
চুকিয়ে ছোটকাকারাও দেখা করে গেল, বুন্নি আর পুচাই এর সাথে লুডোর ম্যাচ ভারি জমে
গিয়েছিল।
টুপাইএর খুব ভালো
লাগতে শুরু করেছিল – সবাই মিলে যে এত ভালো থাকা যায়, মজা করে থাকা যায় ; সে আগে
বোঝেনি। সত্যি তো – এই পরিবার না থাকলে, কি ভাবে সে সেরে উঠত ? কি ভাবে সে এত
ব্যাথা ভুলে থাকতে পারত? সে তো ভেবেছিল, তার ফুটবল খেলাই বুঝি শেষ হয়ে গেল –
কিন্তু বাড়ির সবাই তো সবসময় তাকে হিরো হিসেবেই ভেবেছে, সবাই তার ফুটবল খেলার
দক্ষতা নিয়ে কত্ত প্রশংসা করেছে।
এই একটা
অ্যাকসিডেন্ট টুপাইকে শেখাল – পরিবারের গুরুত্ব। টুপাইএর এখন আর সবার সাথে মিশতে
কোনও আপত্তি নেই। ও ঠিক করেছে, সামনের গরমের ছুটিটা দাদু-ঠাম্মার সাথেই কাটাবে।

Comments
Post a Comment