আচ্ছা দেখুন, যা হবার তা তো হয়েই গেছে; তাই তো সেগুলো আমার অতীত। আমার বর্তমান তো নয়!তাই, এই সব ‘দুষ্টু অতীত’কে বাদ দিয়ে দিতে পারলে, আমরা অনেক হাল্কা হতে পারব, শান্ত হতে পারব, ভালো থাকতে পারব। ঠিক তো?
এইবার, কিছু বিশেষ ধরণের অভ্যাস, যেগুলো বলতে চলেছি, সেইগুলো নিয়মিত করলে কিন্তু আমরা আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে পারব যে, অতীত আমাদের শুধুমাত্র শেখায়, শিক্ষা দেয়, যার নাম ‘অভিজ্ঞতা’; আর এই ‘শিখে নেওয়া’ যখন যাবতীয় জমে থাকা ‘অনুশোচনা’ কে প্রতিস্থাপন করে, ঠিক তখনই আমরা নিজেদের সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে, স্বপ্ন পূরণের দিকে এগিয়ে যাই।
১. নিজের ভালো থাকার রিমোটটা নিজের কাছেই রাখতে হবে। কে, কবে কি বলেছিল, কি করেছিল – সবটাই ‘হয়ে গেছে’। সেই কথা আর ভেবে কাজ কি? মোদ্দা কথা, অন্য কাউকেই আমার জীবনের গল্পে মুখ্য ভুমিকা নিতে দেওয়া যাবে না। যা গেছে তা যাক। আবার হোক নতুন শুরু, আমার সাথে, আমার হাতে, আমার মতন করে।
২. অভিযোগ করবেন না। আমি যেমন ‘পারফেক্ট’ নই, সেরকম পারফেক্ট তো কেউই নয়। ভুল তো সবাই করে। অন্যের করা ভুলগুলোকে ভেবে, অন্যকে ঠিক করার জন্য আমার এনার্জি খরচ করে আর লাভ নেই। আমার সবটুকু এনার্জি এবার নিজেকে শুধরাতে,নিজেকে ভালবাসতে ব্যাবহার করা হবে।
৩. হ্যাঁ, আমি অনেক ভুল করেছি। ঠিক আছে, ভুল তো মানুষ মাত্রেই হয়; আর ভুল করতে করতেই তো ‘ঠিক’টা শেখা যায়। তাই এবার থেকে, কিছু করতে গিয়ে ভুল হলে, ভাবতে হবে ‘আমি ভুল করছি মানে আমি পারি না তা নয়, আমি শিখছি’। এটা নয় যে, আমার দ্বারা কিছু হবে না। নিজেকে আর কখনই ‘ছোট বা হীন’ ভাবা চলবে না, হীনমন্যতায় ভোগা বন্ধ।
৪. নেতিবাচক চিন্তাভাবনা – জাস্ট বন্ধ করতে হবে। যখনই কোনও খারাপ/দুঃখের/পুরনো ব্যাথার কথা মনে আসবে, তখন একপ্রকার জোর করেই স্মৃতির ব্যাগ থেকে অন্ততঃ তিনটে মজার, খুশির, ভালোলাগার মুহূর্তকে খুঁজে বার করে আনতে হবে। এই অভ্যাস চলতে থাকলে, একদিন দেখবেন, “যা হয় তা ভালোর জন্যই হয়” ভাবা খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে।
৫. কিছু করব ভেবে, করার আগে হাজার বার ভাবা – পারব কি না, যদি না পারি লোকে কি বলবে, আমার দ্বারা কি হবে, আমি তো কিছুই পারি না – একদম বাদ দিতে হবে। আগে কবে কখন কি হয়েছিল, সেটা আজ এখন তো নাও হতে পারে, এবং না হওয়ার সম্ভবনাই প্রবল। মানে, কিছু করতে চাইলে, করে ফেলতে হবে। আচ্ছা ভাবুন না, কি হতে পারে শেষমেশ? পেরে গেলে তো জিতেই গেলেন, আর যদি না পারেন? শিখলেন। জীবন শেখায়। তাই না? চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।
৬. নিজের জীবনের বইএর প্রথম পাতার সাথে অন্য মানুষের বইএর ৩৪ পাতার তুলনা করবেন না। এটা আপনার জীবন। বয়স শুধুমাত্র একটা সংখ্যা। নতুন শুরু করার জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। আপনি মনে করলে এক্ষুনি শুরু করতে পারেন, নতুন কিছু, নতুন ভাবে। অন্যেরা যা করছে, আপনি সেটা নাও করতে পারেন। এতে আপনি যে ‘ভুল’ করছেন বা ভাবছেন এমন তো নয়; বরং আপনি আপনার মতন অন্যরকম কিছু করতে চাইছেন। ইটস অ্যাবসোলিউটলি ওকে। নিজেকে নিয়ে ভাবুন। নিজে সবচেয়ে ভালো কি পারেন, দেখুন – নিজেকে তৈরি করুন নিজের মনের মতন করে।
৭. সাফল্যের বিপরীত কিন্তু ব্যর্থতা নয়। বরঞ্চ ব্যর্থতাই হল সাফল্যের সিঁড়ি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রোজ নিজেকে বলুন – ‘আমি তোমায় ভালোবাসি, আমি সফল, আমি পারি আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান দিতে......’ । দেখবেন, আস্তে আস্তে বিশ্বাসটা জোরদার হচ্ছে, নিজের আচরনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারবেন।
৮. ইন্টিউশান, গাট ফিলিং – শব্দগুলোর সাথে পরিচিতি আছে তো? তাহলে, জীবন পথে যখনই এদের অনুভব করবেন – নিঃশর্তে সাড়া দিন, শুনুন, মানুন। মোক্ষম !!
৯. অশ্রদ্ধা সর্বনাশা।হয়তো বহুবার আপনি অশ্রদ্ধার স্বীকার হয়েছেন মানছি, বদলে, আপনি কি ফেরত দিয়েছেন, সেটা একবার মনে করুন তো? অশ্রদ্ধা ফেরত না দিলেও, উষ্মা কি পরে নি? নিউটনের তৃতীয় সুত্রের অবিকল হল আমাদের জীবন – একদম আয়নার মতন। যা দেখাবেন, তাই দেখবেন। মানে, আপনি যা দেখছেন ; একটু মন দিতে ভেবে দেখুন – কোথাও গিয়ে আপনি কিন্তু এইরকমই কিছু দেখাচ্ছেনও। মানে ধরুন, আপনি কাউকে সাহায্য করলেন, এর অর্থ কিন্তু এই নয় যে, সেই লোকটিই প্রতিদানে আপনাকে সাহায্য করবে, আপনি দেখবেন, আপনার এই কর্মের প্রতিদানে অন্য কারোর কাছ থেকে, অন্য কোনও সময়ে আপনি সাহায্য পেয়েছেন বা পাচ্ছেন। এইটা কিন্তু সব ক্ষেত্রেই খাটে।যেটা বলতে চাইছি – অন্যকে শ্রদ্ধা হয়তো নাই বা করলেন; কিন্তু নিজেকে তো শ্রদ্ধা করুন; নিজের আচরন-উচ্চারণ-মননকে শ্রদ্ধা করুন। নিজের মনে, নিজের উদ্দেশ্যে কত খারাপ কথা বলা হয় – তার হিসেব করেছেন কি কোনদিন? ভাবুন একবার; যেদিন আপনি নিজেকে শ্রদ্ধা করা শুরু করবেন; দেখবেন, আয়নার প্রতিচ্ছবির মতন পারিপার্শ্বিক থেকেও আপনি অনুরূপ অনুভব করছেন। এটা বৈজ্ঞানিক ভাবে সত্য।
১০. ‘গাল্লি বয়’ সিনেমায় নায়ক তার বাবাকে বলে – ‘আমায় অন্যকেউ বলে দেবে আমি জীবনে কি করব?’ এবং গল্পে দেখা যায় এই কথা বলার পর নায়ক পরবর্তী সময়ে নিজের সিদ্ধান্তকে সফল করছে, নিজের চেষ্টায়। তাই বলি কি, আমাদের চারপাশে সক্কলে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী; সবার পরামর্শ শুনবেন; কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার জীবনের ছায়াছবিতে মুখ্য ভুমিকায় আপনারই থাকার কথা।তাই অন্যকেউ কিছু ‘হতে’ বললে, সেটাই যে হতে হবে, এমনটা নয় কিন্তু।নিজের সাথে কথা বলুন বারবার। নিজে সিদ্ধান্ত নিন, নিজের সিদ্ধান্তকে সম্মান করুন।স্বনির্ভর হোন। আত্মসম্মানবোধ (Self Esteem)এবং আত্মগর্বিতার(Ego)মধ্যে তফাৎ আছে।
১১. যারা চলে গেছেন, যে সব প্রিয়জনকে আমরা হারিয়েছি, বারবার তাদের কথা মনে এলে চোখ ভিজে যায় অজান্তে, আমরা বিহ্বল হয়ে পরি। অনেক কাজের সময় হারিয়ে যায় – পুরনো স্মৃতি প্যারেড করতে করতে হুড়মুড় করে চলে আসে একসাথে। বন্ধ করতে হবে এবার। হ্যাঁ, আমায় আপনি এজন্য যা কিছু ভাবতে পারেন, আমি কিচ্ছু মনে করব না। কিন্তু একবার সাথে এটাও ভাবুন, যারা আমাদের প্রিয়জন, তারা কি চাইত আমাদের চোখে জল দেখতে, আমরা দুঃখে আছি জানলে, তারা কি ভালো থাকত? “না”। তাহলে? এটা কি উচিৎ নয় যে, প্রিয়জনকে মনে করার সময়, তারা আমাকে যেমন দেখলে খুশি হতেন তেমন থাকা? সময় লাগবে জানি, তবে, শুরু করলে একদিন দেখবেন, পারছেন।
এবার থেকে সবকিছুই একটু অন্যরকম করে ভাবা শুরু করুন প্লিস। যা চাইছেন, তা পেতে গেলে, যা এতদিন করছেন, সেটা ছেড়ে তো অন্য কিছু করতে হবে, অন্য ভাবে। তাই না? একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন – দেখবেন, যা চাইছেন, তাই হচ্ছে।
মনে রাখবেন, আমাদের অতীত ইস নট ইক্যুয়াল টু আমাদের ভবিষ্যৎ।
অতীত আমাদের শেখায়, আবার এটাও জানা উচিৎ যে, জীবনে এগিয়ে যেতে গেলে, অতীতকে বিসর্জন দিতে হয়।
শেষে সেই এক কথা – চাইলেই হবে, তাই চাইতে হবে!!
অভিনন্দন।
ভালো থাকবেন।
জয়তি

Comments
Post a Comment