ডিপ্রেশনের বাংলা নাকি নিম্নচাপ ?
বৃষ্টি এল। সঙ্গে কফি এক-দু’কাপ
নামছে বিকেল, অল্প ভিজে রাস্তাঘাট
ছাতার নীচে মিইয়ে গেল পাপড়ি চাট
বন্ধুরা সব ফিরছে বাড়ি দূর থেকে . . .
কেন যে আজ হিংসে হল তাই দেখে,
দেখতে গিয়ে সন্ধে হল জানলাতেই
আগের মতো মেঘ করেছে . . কান্না নেই
কেবল মুঠোয় বন্দী কফির একলা কাপ
ডিপ্রেশনের বাংলা জানি- মনখারাপ।
শ্রীজাতর বিখ্যাত
কবিতা – ডিপ্রেশান নিয়ে।
তবে,সত্যি বলতে
কি ডিপ্রেশান মানে কিন্তু মন খারাপ নয় – এটা একটা অসুখ, মানসিক অসুখ।
আমাদের ছোটবেলা
থেকে শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য অনেক রকমের যত্ন নেওয়া হয়, শেখানোও হয়; কিন্তু মনের
স্বাস্থ্যটা উহ্যই থেকে যায়। দাম পায় না। মন খারাপ হলে, সেভাবে শেয়ার করার জায়গাই
পাওয়া যায় না। জাজমেন্ট শোনার ভয়ে নিজের মনের কথা নিজের মনেই থেকে যায়। সবার সাথে
একসাথে থেকেও নিজেকে একা মনে হয়।
চিকিৎসা
শাস্ত্রে, ডিপ্রেশানকে মুড ডিসঅর্ডারের(মেজর ডিপ্রেশান থেকে ডিস্থাইমিয়া) লিস্টে
স্থান দেওয়া হয়েছে। তো, এই মুড বা মেজাজটাই যে আসল রাজা সেটা আমরা সবাই জানলেও ক’জন
মানি? মেজাজ খারাপ হলে, কি ভাবে ঠিক করা হয়? ঠিক করার ইচ্ছে কি হয়? ঠিক করার উপায়
কি ঠিকঠাক জানা থাকে?
একটু গভীরে ভাবলে
দেখা যাবে, আমাদের মেজাজটা দিনের বেশীরভাগ সময়েই খারাপ থাকে – গরম পরেছে খুব,
বৃষ্টি হচ্ছে প্রচণ্ড, কি শীত রে বাবা – তারপর পলিটিশিয়ান, রাজনীতি, বাসের অশান্তি,
অফিসের অশান্তি, বাজারের দাম, রাস্তার লোকজন, খবরের কাগজ, টিভির খবর, পাড়াপড়শির
হালহাকিকৎ, বাড়িতে রান্নায় নুন কম, তেল বেশি, কথা কাটাকাটি, সোশ্যাল মিডিয়ায়
পোস্ট, ছেলের মেজাজ, মেয়ের মেজাজ, বউয়ের মেজাজ, বরের মেজাজ, কাজের লোকের মেজাজ - আর
এখন তো করোনা !!
টাইম হীলস।
সত্যি। সময় ভুলিয়ে দেয়, আর আমরা মেজাজ ঠিক রাখার জন্য শুধু সময়কে হাতিয়ার করে সাময়িক
ঠিক হয়ে যাই। হ্যাঁ, সাময়িক।
মহাশয়, মেজাজ
বিগড়নোর ক্ষেত্রে আমরা মাহির। এই মেজাজ বিগড়নো কিন্তু শিক্ষা- অর্থ-সাফল্য-যশ
কিছুই মানে না। স্টেজে স্টেজে মন ভালো রাখার উপায় বিলনো মানুষটারও কিন্তু মেজাজ
খারাপ হয়। এটা স্বাভাবিক। যেটা কথা – এই মুড অফ বা মেজাজ খারাপকে বাগে আনা।
আমাদের এই তু তু –
ম্যায় ম্যায় এর যুগে আমরা বাবামায়েরাই ছোটদের শেখাই সবসময় নিজের চরকায় তেল দিতে।
আমার মনে আছে, আমি যখন ছোট ছিলাম, শ্যামবাজারে থাকতাম। মা-বাবা দুজনেই অফিস যেতেন।
পাড়য় বাবার সব বন্ধুরা, অন্য বাড়ির বড়রা সবাই আমাদের অভিভাবকের মতন ছিলেন। কেউ
কিছু বললে বা বকলে – বাড়ি এসে নালিশ করার সাহস ছিল না। তেমনি সাহস ছিল না স্কুলে
টিচার কিছু বললে বা বকলে সেটা বাড়ি এসে বলা। বাড়ির দিদ-দাদু, ঠাম্মা-ঠাকুরদা এরা
ছিলেন আমাদের কমফর্ট জোন। ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে রাগারাগি হলে, কথা বন্ধ হত আবার
দু দিন পরেই সব ঠিক।
আর, এখন আমরা
ঝগড়া করি, রাগারাগি করি, গালমন্দ করি, কথার চাবুক দিয়ে অন্যকে আঘাত করি, একবারও
ভাবি না, তার কি মনে হচ্ছে। আবার কত কথা বলা হয়ে গেলেও দেখা যায় যে নিজের মনের
কথাগুলো বলা যাচ্ছে না, একদিন আসে, সব শেষ হয়ে যায় – আর না বলা কথাগুলো না বলাই
রয়ে যায়।
নিজের একটা
অভিজ্ঞতা বলি – প্রায় বছর সাতেক আগের কথা। একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের গৃহবধূ আসেন
আমার কাছে কাউন্সেলিং এর জন্য। তিনি জানান – কিছুদিন ধরে তার মন খুব খারাপ; কিচ্ছু
ভালো লাগছে না। কিন্তু তিনি কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না। সুখী পরিবার, কোনও কিছুর
অভাব নেই – তাও। তার অনেক বন্ধু-বান্ধবী আছে, তাদের কাছে উনি শেয়ার করতে পারছেন না
এই মন খারাপের কথা। তাই তিনি আমার কাছে এসেছিলেন। এই সুত্রে একটা কথা বলি –
সমস্যাকে চিনতে পারলেই কিন্তু আদ্ধেক সমাধান তখনই হয়ে যায়। আর, মনের ব্যাথা কে
চিনিয়ে, নিজের সমস্যা নিজেকে দিয়েই সমাধান করানোই হল আমাদের মতন কাউনিসলরদের কাজ।
আমরা শুনি, আমরা কথা বলাই, আমরা কথা বলাতে বলাতে নিজেকে চিনতে সাহায্য করি – সাথে কিছু
তথ্য শুধু দিতে থাকি। সেই গৃহবধূ একদিন আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে স্বীকার করেন –
তিনি সাজগোজ করেন তার স্বামীর ভালো লাগে বলে, সেই রঙগুলোই বেশি পরেন, যেগুলোতে তার
স্বামী তাকে দেখতে ভালোবাসেন। তিনি সেইসব রান্নাবান্নাই করেন- যেগুলো তার ছেলেমেয়ে
খেতে ভালবাসে। তিনি যা চান- তাই করতে পারেন কিন্তু তিনি, সকলে যা চায়, সেটাই করেন।
এতদিন তিনি ভেবে চলছিলেন, এটাই তার ভালো থাকা, কিন্তু ইদানীং তিনি বোধ করছেন,
নিজের ভালোলাগাগুলো বড় বেশি বাদ পরে যাচ্ছে – এই ভাবনা তাকে অপরাধী করে তুলছে, মন
খারাপ করাচ্ছে। এটা টকিং থেরাপি। ঠিক মানুষের কাছে মন খুলে কথা বলা – যেখানে তাকে
কেউ জাজ করবে না, লেবেল করবে না, ভুলগুলোকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাবে না তবে ভুল থেকে
ঠিক পথ খুঁজতে সাহায্য করবে। আমি বলব, এটার জন্য সবসময় কাউনিসলর না হলেও চলবে ;
একজন ভালো বন্ধু কিন্তু এই কাজ অনায়াসে করে দিতে পারে।
আজকাল দেখা যায়,
মানুষের ‘সত্যি বন্ধু’র খুব অভাব। হ্যাঁ – হুল্লোড় করতে, পার্টি করতে, দল বেঁধে
বেরাতে যেতে অনেককেই পাওয়া যায়; কিন্তু এমন বন্ধু কি আছে – কদিন কথা না বললে, ফোন
না ধরলে – বাড়ি এসে হামলা করবে – জড়িয়ে ধরে বলবে ‘আমি আছি তো’।
সুশান্ত সিং
রাজপুত – একজন সফল নায়ক, দুরন্ত নাচিয়ে, সাফল্যের গ্রাফ যার উর্ধমুখী, সে কিনা
আত্মঘাতী !! তার প্রথম ছবি ‘কাই পো চে’র চরিত্র ‘ঈশান ভট্ট’ জিততে জানত, শেষ ছবি ‘ছিছোরে’
র ‘অনিরুদ্ধ পাঠক’ নিজের ছেলেকে , যে সুইসাইড করতে গিয়েছিল,তাকে বাঁচার পাঠ শিখিয়েছে।
এই ঘটনা আবার জানিয়ে দেয় – রিল লাইফ আর রিয়েল লাইফের তফাৎ। নিজেকে ফিল্মের ক্যামেরার
সামনেই শুধু এক্সপ্রেস করতে জানলে চলবে না, জীবনের ক্যামেরার সামনেও এক্সপ্রেস করা
শিখতে হবে। মন খারাপ করা মুখের ছবি আমরা নিজেরাই কখনও তুলি না – তাই তো?
বন্ধু খুঁজে না
পেলে, নিজেই নিজের বন্ধু হতে ‘শিখতে হবে’। আমরা সবাই একা – এই একাকীত্ব যে দিন
আমরা উপভোগ করতে শিখব, নিজের সঙ্গকে সেলিব্রেট করা শুরু করব, দেখব ‘এই আকাশে আমার
মুক্তি আলোয় আলোয়’।
মানসিক স্বাস্থ্যকে
গুরুত্ব দিন।
কথা বলুন। মন
খুলে কথা বলুন। দরকার হলে, প্রফেশনাল হেল্প নিন।
ভালো থাকা খুব
সহজ, সত্যি বলছি।
চাইলেই হবে, তাই
চাইতে হবে।

Apurbo .very nice
ReplyDelete