Skip to main content

উপহার

 




আজ মনটা একটু বেশীই খুশি খুশি তৃষার। এই প্রথম সে ডেটে যাবে। অফিসের কাজে একদম মন বসছিল না। কখন যে পাঁচটা বাজবে। দুদিন ধরে প্ল্যান করছিল, কি পরা উচিৎ। শেষ মুহূর্তে মাথা কাজ না করায় একটা হ্যান্ডলুমের লাল-হলুদ শাড়ি পরেই চলে এসেছে। অফিসে আসতে আসতে ভাবছিল – এটাকে কি সত্যি ডেট বলা যায়? মহাশয় বহুদিন ধরেই একজন একটাকা বাবার কাছে যাবার প্রস্তাব দিচ্ছে। সেখানে গেলে নাকি অনেক সমস্যার সুন্দর সমাধান হয়ে যায়। বহুদিন মানে, বছর দুয়েক। এই নাচার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না; কিন্তু এই সময়টা হঠাত বিকট রকমের প্রতিকূল হয়ে পরায় একবার মনে হল.... গিয়েই দেখা যাক না। প্রস্তাবদাতাকে বলতেই, সম্পূর্ণভাবে চমকে দিয়ে যে উপরি পাওনাটা হল – সেটাই আজকের ডেট।

পুরনো ভালোলাগার সাথে বহুদিন পর বিবাহিত হয়ে দেখা হলে যে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা থাকে, হয়তঃ সেই থেকে বিরত থাকতেই ‘দেখা না’ হওয়াটাকে নিরুক্তিতেই সহমত দিয়েছিল দুইজনই। তাই গুচ্ছ ফোনালাপ হলেও দেখা হওয়া বলতে হয়ত যাতায়াতের পথে দোষ মিনিটের সময়। তার মধ্যেই কথা কম এবং ‘বই’ বেশি দেওয়ানেওয়া হয়েছে।  

এইবার মহাশয় প্রস্তাব দিয়েছেন ডিনারের। খামোশী ছবির ”আজ ম্যায় উপর -  আসমান নীচে’ গানটা আজকে আমার জন্য অব্যর্থ, তৃষা ভাবে; – বাসে বসে কানে তার গুঁজে এই গানটাই শুনতে শুনতে এসেছে সে।  

সাড়ে ছ’টার মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছে যায় তৃষা। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে তেনার। ফোন আসে – আচ্ছা – আমাকে কি যেতেই হবে? তুই পারবি না? অদ্ভুত একটা রাগ-অভিমান-কাতরতা মেশানো অনুভূতি জোর দেখায় –“না, তোকে আসতেই হবে। এখন একথা বলছিস, কতদুরে তুই?” উত্তর – ‘পাঁচ মিনিটে বাস থেকে নামছি’। আচ্ছা, এই যদি হয়, তাহলে ফোন করার কি দরকার ছিল? তৃষা মনে মনে ভাবে আর হাসে।

আবার ফোন – রাস্তা ক্রস করে এই ফুটে চলে আয়।

তুই কোথায়? আমায় দেখতে পাচ্ছিস?

হ্যাঁ, লাল শাড়ি পরে এসেছিস। রাস্তা ক্রস করে চলে আয়।

আমি তো তোকে দেখতে পাচ্ছি না, কোনদিকে যাব?

সোজাসুজি ক্রস কর।

ক্রসিঙ্গের লাইট সবুজ হতে মাত্র ৩ সেকেন্ড। দৌড়ে রাস্তা ক্রস করে তৃষা দেখল, মহাশয় কাপড়ের লম্বা হ্যান্ডেলওায়ালা ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে’ ইস! সময়টা যদি থমকে যেত!!

এই যে লাইনে দাঁড়িয়েছিলিস, এরা সবাই সকালে নাম লিখিয়ে গিয়েছে। নাম না লেখালে, এদের শেষ হলে তুই চান্স পাবি – তাহলে তোকে ওই লাইনটায় দাঁড়াতে হবে আর বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় ১২ টা। এর জন্য আগে থেকে নাম লেখানো বেটার।

মানে? আমাকে সকালে এসে নাম লিখিয়ে অফিসে যেতে হবে আর বিকেলে এসে এই বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে বাবা র দেখা পাওয়া যাবে?

হ্যাঁ, কেষ্ট পেতে গেলে তো কষ্ট করতেই হবে।

কে বোঝাবে , আমার কেষ্ট তো সামনেই দাঁড়িয়ে। তৃষা আবার হাসে মনে মনে। ঠিক আছে। সামনের মঙ্গলবারেই আসব। মনে আশা জাগে, এভাবে সত্যি যদি সব কাটিয়ে ওঠা যায়......

শোন, আমি একটু ওইদিকে মসজিদের দিকে যাব, তুই যাবি না এখানে ওয়েট করবি? পাগল, এই সুযোগ কেউ হাত ছাড়া করে, মনে মনে ভেবে তৃষা বলে – আমিও যাব, এখানে দাঁড়িয়ে করব কি।

মানে, আমি লুঙ্গি কিনব।

লুঙ্গি? কার জন্য?

আমার জন্য।

তুই লুঙ্গি পড়িস? হায় রে! আজকালকার ছেলে হয়ে তুই লুঙ্গি পড়িস – জাস্ট ভাবাই যাচ্ছে না।

বা রে, তোরা বাড়িতে নাইটি পরে ঘুরতে পারিস ... হু হু করে নীচে হাওয়া ঢোকাস, সেটায় কোনও সমস্যা নেই; আর আমরা লুঙ্গি পরলেই খারাপ। দ্যাটস নট রাইট।

বোঝো কান্ড। এরপরে কি কিছু বলা যায়।

মসজিদের পাশে সার বেধে কয়েকটা লুঙ্গির দোকান। দেখলাম, মহাশয় হাল্কা রঙ বেছেই কিনলেন। আমিও যেচে পরে সাহায্য করলাম একটা পছন্দ করতে। সাথে জিজ্ঞাসা – আচ্ছা, এই জায়গা থেকে লুঙ্গি কেনা হচ্ছে কেন? কোনও বিশেষ কারণ কি?

শোন, লুঙ্গি এদের পোশাক, আর নিজের ধর্মস্থানের বাইরে আশাকরি এরা কাউকে ঠকায় না। এটাই কারণ।

দীর্ঘশ্বাস! চমক... আর তৃষা মনের মণিকোঠায় জমাতে থাকে সবকিছু।

একটু হাঁটতে পারবি? তাহলে একটা ভালো রেস্টুরেন্ট আছে কাছেই, ওখানেই যাওয়া যায়. 

চল। (পাশে পাশে হাঁটার মত রোম্যান্টিক কিছু আছে না কি?) তৃষা এক কথায় রাজি।

না, তোর কোনও অন্য জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে বল।

খাওয়াটা তো একটা উপলক্ষ রে। তোর সাথে সময় স্পেন্ড করছি, এটাই অনেক। বাই দ্য ওয়ে, আমি কিন্তু ফুটপাথের দোকানের ডিম-ভাত খেতেও ভালোবাসি।

আমাকে কিপটে বলেছিলি, এই বদনামটা অ্যাটলিস্ট ঘোচাতে দে।  

পায়ে পায়ে চলতে চলতে মিনিট দশেকের মধ্যেই চলে এল রেস্টুরেন্ট। বাহারি রিসেপশানের ঘেরাটোপ কাটিয়ে চলে এল ডাইনিং স্পেসে। সামনের দিকের কর্নারে টু বাই টু বসার জায়গা দেখে সামনা সামনি বসা হল। তৃষা পুরো ঘোরের মধ্যে। কি অর্ডার দেওয়া হচ্ছে, চারদিকে কারা বসে আছে ..... কিচ্ছু নজরে নেই। একবার শুধু উত্তর দিল, তুই যা ভালো মনে করিস, খাওয়া।

কি কি কথা হচ্ছিল, কিচ্ছু তেমন মগজে ঢুকছিল না। তৃষার চোখ শুধু আর্তি জানাচ্ছিল সেই প্রবল প্রতাপান্বিত শক্তিকে – শুধু এই মুহূর্ত টা যেন শেষ না হয়।

একটা অসাধারন চিকেন প্রিপারেশান ছিল মেনুতে, গোটা কাজু দিয়ে মোরা – টেস্টটা সত্যি না ভোলার মতনই। সেটা শেষ হতে না হতেই, মহাশয়ের আহ্লাদ ভরা আবদার – পুডিং খাবি? ডিসিপ্লিন্ড লাইফ  নিজের পেটাই করা চেহারায় ফুটিয়ে তুলে সামনের জলহস্তিনীকে পেট পুরে খাইয়ে তারপর পুডিং এর প্রলোভন – এর মধ্যেকার মনস্তত্ব টা বোঝার চেষ্টা আর করল না তৃষা। এক প্লেট পুডিং দুজনে মিলে ভাগ করে খাওয়ার রোমাঞ্চ অনেক বেশি ছিল তার কাছে।

ঘড়ির কাঁটা দেখায় রাত বাড়ছে। রেস্টুরেন্ট এর চৌকাঠ পেরোতে গিয়ে, তৃষার চোখ জলে ভরে, এত সুন্দর সময়টা যে শেষ হয়ে গেল বড্ড তাড়াতাড়ি। কত কত কত দিনের স্বপ্ন পুরন !! মোবাইল বের করে ক্যাব বুক করবে ..... মহাশয় বলে ওঠে; আমি বুক করছি।

মানে? তুই ওইদিকে কি করতে যাবি?

তোকে ড্রপ করে বাড়ি যাব। (মহাশয়ের বাড়ি কিন্তু তার বাড়ির ঠিক উল্টো পথে)

নোনা জল একরাশ আনন্দ নিয়ে গাল ছুঁয়ে যায়।

ক্যাবে পিছনের সিটে দু জানলা ঘেঁসে দুজনে বসে। একটা বাঁ হাত আর একটা ডান হাত প্রায় ছ’ ইঞ্চির দুরত্ব বজায় রেখেই যায়। মুখ কথা বলে, মন ভেসে চলে।

জীবন সত্যি এমন উপহারগুলো দেয় বলেই তো বাঁচতে ভারি ভালো লাগে।

রাতে বিছানায় শুয়ে তৃষা ভাবে, ‘এক টাকা বাবা’ সত্যি খুব শক্তিশালী। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এখন, মঙ্গলবার সকালে গিয়েই নামটা লিখিয়ে আসবে।   


Comments

Popular posts from this blog

‘হো’ওপনোপনো’

কথায় আছে লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো? ক্ষমা কি করা যায়, যদিও বা যায়... সেটা কি ভোলা সম্ভব? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় একটা বড় ভুমিকা নেয়, দিন যেতে যেতে ঘটনার অনুভুতির তীক্ষতা কমতে থাকে, আমরা মনে করি ‘ভুলে গেছি’; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য অনুরূপ কিছু হলে বা মনে পড়লেই দগদগে ভাব নির্লজ্জের মতন বেরিয়ে পরে।  হ্যাঁ, আমিও বলছি, ভালো থাকতে গেলে এই –“ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট” যাদুর মতন কাজ করে। একটা সত্যি ঘটনা বলি আজকে, আমার জীবনের। আমার বাড়ির পাশেই একটা কোচিং সেন্টারে আমার ছেলে পড়ত। ঘটনাক্রমে, সেন্টারহেডের ছেলেও আমার ছেলেরই ক্লাসের বন্ধু। প্রচলিত আছে, সেই সেন্টারহেড (নাম ধরে নিই ‘ক’বাবু) ভালো ছাত্রছাত্রী ছাড়া সেই সেন্টারে পড়ান না। তাই, আমার ছেলে যখন ক্লাস সেভেন (ছেলে আমার বরাবরই ৬০% পাওয়া – ছোটবেলায় লারনিং ডিসঅর্ডার ছিল) তখন তিনি তাকে যোগ্য মনে করেন নি সেই সেন্টারের। ক্লাস নাইনের সময়, আমি দেখলাম, ওর ক্লাসের অনেকজন ওই সেন্টারেই পড়ে আর বাড়ির পাশে বলে, আমারও সুবিধে হবে, অনেকগুলো পথ খরচ বেঁচে যাবে... এইসব ভেবে আবার গেলাম ‘ক’ বাবুর কাছে, অনুরোধ করলাম আমার ছেলেকে ভর্তির জন্য; বদলে ...

শিক্ষা

  একবার হয়েছে কি, ভীষণ উত্তেজনাবশতঃ বেশ কড়া দামে টিকিট কেটে দেখতে গিয়েছিলাম একটা সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। তারপর…. একঘণ্টা যেতে না যেতেই প্রান হাঁসফাঁস, হাত কামড়ানো। মনে যুদ্ধ চলছে – ‘এত খাজা ছবি কি করে হতে পারে’র সাথে ‘ঈশ, কত খরচ হয়ে গেল’র। ভাবতে ভাবতে, পকেট আরও খসিয়ে পপকর্ণ আর কোল্ড্রিঙ্কও খাওয়া হয়ে গেল। হল থেকে বেড়িয়ে কান মুলেছিলাম, এমন বোকামি আর হবে না, শপথ টপথও নিয়েছিলাম খানিক। বলুন তো, আসল বোকামিটা কোনটা ছিল? দামী টিকিট কেটে বাজে সিনেমা দেখা না কি সিনেমাটা বাজে বুঝেও, বেশি খরচ হয়ে গেছে এই ভেবে, হলে বসে নিজের সময় বরবাদ করে পুরো সিনেমাটা হজম করা? নিজেদের জীবনের দিকে একবার ভালো করে তাকাই তো; আমাদের সম্পর্কগুলোও অনেকটা এইরকম নয় কি? কাজ করছে না জেনেও, লেগে থাকি, সম্পর্কের ভার বয়ে চলি অনেক ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গেছে, লোকে কি বলবে… এইসব ভেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে যে সবচেয়ে দামী ইনভেস্টমেন্টটা পাঁকে চলে যাচ্ছে…মানে “সময়”…যেটা আর ফিরে আসবে না, তার কথা ভাবা হয়ে ওঠে না।   কিছুই কিন্তু অপূরণীয় নয়। আপনি না থাকলে, বা আমি না থাকলে সব কি থমকে যাবে? কিছুদিন আগে ইন্সটাগ্রামে একটা পোস্ট দেখে...

হাল্লা চলেছে যুদ্ধে!!

  শুন্ডির রাজা আজও অচেতন, হাল্লা চলেছে যুদ্ধে, আর আমরা ঘুমাই প্রতিক্রিয়ায়; স্বপক্ষে - বিরুদ্ধে। সকাল থেকে উঠে সারাদিন, তারপর সারারাত... কে কি ভাবছে, বলছে -করছে ভেবে যাই সাতপাঁচ। পুঁজি জমছে ব্যাঙ্কে আর সুগার-প্রেসার ঘরে; লাগামহীন অ্যাড্রিনালীন সর্বত্র ছিটকে পরে। মনখুলে আজ হাসতে গেলে ভরসা লাফিং ক্লাব, নিজেকে হারিয়ে ফেলার খেলায় মেতেছি আমরা সব। গুপী গাইন – বাঘা বাইন সিনেমা দেখে নি, এমন কেউ আছে কি? সিনেমার একটা গানের লাইন ‘হেডিং’ দিলাম লেখায় আর, শুরু করার সময় অনুরোধ রাখছি, আরেকটা গান মনে করার... “এক যে ছিল রাজা, তার ভারি দুখ”। এই গানটায় তিনটে প্রশ্ন করা হয়েছে– দুঃখ কীসে হয়, দুঃখ যাবে কি আর দুঃখ কীসে যায়। এবং উত্তরও দেওয়া হয়েছে (গানটা মনে করুন, নতুবা শুনে ফেলুন আরেকবার)। তো, আমি কেনই বা আজ এই কাজ করাচ্ছি আপনাদের দিয়ে, জানতে চাইবেন নিশ্চয়ই।   আরেকটা সিনেমার প্রসঙ্গ টেনে মুল কথায় আসার চেষ্টা করছি। কয়েকবছর আগে আমির খানের একটা ছবি এসেছিল, অ্যাডাল্ট ফিল্ম – ‘তারে জমীন পর’, হয়তো দেখে থাকবেন। অ্যাডাল্ট বললাম, কারণ, আমি সর্বতঃ ভাবে বিশ্বাস করি, সিনেমাটির মাধ্যমে যে ম্য...