রোজ অফিস থেকে ফেরার পথে মাকে ফোন করতাম, কি কি আনতে হবে জানতাম; কোনও কোনোদিন মা মেসেজ করে দিত; সেদিন – ৩০শে ডিসেম্বর; সোমবার ছিল। মা বলেছিল বিস্কুট নিয়ে আসতে। অটো করে বৈশাখীতে নেমে হাঁটতে হাঁটতে কেষ্টপুর। এসেই মনে পরল, আজ তো সোমবার, বাড়ির পাশের দোকানটা বন্ধ। বাড়ি এলাম বিস্কুট না নিয়েই। এসেই তড়পাই – তাতানকে তো বলা যেত। সবসময় আমি কেন আনব। চিরকালের ম্যানেজ করা স্বভাব মায়ের। সকালে বিস্কুটটা নাতির চাইই চাই। নো প্রবলেম; চারতলার পুলকদা কে ফোন করে বলে দেওয়া হল, আসার সময় তার দোকান থেকে যেন এক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে আসে।
আমি তো রাজরানী টাইপ। খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পরেছি। তখন প্রায় রাত সোয়া ১১টা; তাতানের চিৎকার – ‘বুয়া মা – কি হল?’; ধরমর করে উঠে দেখি, মা দরজার সামনে পরে আছে, হাতে বিস্কুটের প্যাকেট, দরজার পর্দা রডসহ খুলে পরে আছে। পুলকদা দাঁড়িয়ে। বেল বেজেছিল, তাতান আলস্যভরে দরজা খোলে নি। মা খুলতে গিয়ে, পায়ের স্টেপ গড়বর করে, পর্দা ধরে সাপোর্ট নিতে গিয়ে –ধপাস।
হাত ভেঙ্গে গিয়েছিল বোঝা যাচ্ছিল। পরে এন আর এস-এ গিয়ে জানলাম, পায়ের ফিমার বোনও ফ্রাকচারড।অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এন আর এস থেকে ক্যালকাটা হার্ট ক্লিনিক, তারপর কলম্বিয়া এশিয়া। জানা গেল ব্যাপারটা সিরিয়াস। ইমিডিয়েট অপারেশান প্রয়োজন।
অপারেশান হল। মা’কে বাড়িতে নিয়ে এলাম। দুবেলা আয়া রাখা হল। সেবা করা আমার আসে না - পার তো পাওয়া যায় না; জীবন পরীক্ষা নিয়েই নেয়। কত সেবা করতে পেরেছি জানি না, তবে পরীক্ষায় উৎরাই নি। যে মানুষটা আমার খুঁটিনাটি সবকিছুর যত্ন নিত, তাকে যে ভুল ওষুধ খাওয়াচ্ছিলাম – সে খেয়াল এলো তখন যখন ডাক্তার বললেন প্লেটলেটস ভয়ানক কম (হয়ত আরও অনেক কারণ ছিল, কিন্তু একটা ওষুধ দশদিন পর বন্ধ করে দিতে হত, আমি প্রায় একুশ দিন খাইয়ে ফেলেছিলাম...)। আবার সেই আফসোস, আবার...
‘২0 র ৩১শে জানুয়ারি; সকালে ব্লাডটেস্টের রিপোর্ট দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল আবার হসপিটালে ভর্তি করার। এইবার জড়িয়ে যাওয়া উচ্চারণে সে বলেছিল –“আমি যাব না”, এই প্রথমবার সে বলেছিল। আমি জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম – তাড়াতাড়ি সেরে যাবে, বাড়ি নিয়ে আসব। পারি নি। আরেকজনও আমায় বলেছিল, হাস্পাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে যেতে, আমি পারি নি। এরকম আর কত যে ‘না পারা’ পেরে যেতে হবে.....
গতবছর ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে যে মা’কে হারালাম, আমি তাকে চিনতাম না; সত্যি চিনতাম না। কি ভীষণ রকম বদলে গিয়েছিল সে। যে শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে বড় হয়েছি, সেই গোটা চেহারাটা একদম অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। আমি জানি না, আমার ভেতরে এক অদ্ভুত রকম রাগ জমতে শুরু করেছিল, মা’কে দেখতে যেতাম না শেষ ক’দিন। দেখতেই পারতাম না। সেই ৮ তারিখ সকালে একবার গিয়েছিলাম – এক অদ্ভুত দর্শন মহিলার বেড এর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, বেড নম্বর জানিয়েছিল, শুয়ে থাকা মানুষটি না কি আমার মা। আমি হাত টিপেছিলাম জোরে, যদি চিৎকার করে – কোনও সার ছিল না। মুখের দিকে একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিয়েছিলাম। কানে কানে বলে এসেছিলাম – তুমি চলে যাও, আমি সব সামলে নেব, চিন্তা করো না। অন্যদিনের মতন সেদিন ডাক্তারের সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা আর করতে পারি নি।অফিস চলে গিয়েছিলাম। রোজকার মতন ভাবছিলাম, কখন খবর আসে। মন বলছিল, বৃষ্টি হলেই চলে যাবে। সবাইকে বলেছিলাম, বিকেলে যাব না। কিন্তু সেদিন গিয়েছিলাম...বিকেলে। দেখি, সেদিনই কতজন তার সাথে দেখা করতে এসেছে।
৯ বছর আগে, ২৮শে এপ্রিল রুবি হাসপাতালে, আমি দেখা করার সাথে সাথেই পাশে রাখা মনিটরে উঁচুনিচু গ্রাফটা সরলরেখা হয়ে গিয়েছিল, আমার জাস্ট আগেই মা-বুয়া একসাথে দেখে এসেছিল, মা তো বুড়ো আঙ্গুল ধরে বলেওছিল – এখনও আছে...আমি গিয়ে দেখলাম – শেষ। গত বছর ৮ই ফেব্রুয়ারি, সন্ধ্যেতে ভিসিটিং আওয়ারের পর যখন ডাক্তারের সাথে দেখা করতে গেলাম – বেড নম্বর বলাতেই বললেন –“এক্ষুনি এক্সপায়ার করলেন”। গতবার চোখ, এইবার কান !! জীবনের কি ভীষণ দাবী!!
আমাদের বাড়ি সবসময় জমজমাট থাকত। সল্টলেকে থাকতে আমাদের বাড়িতেই সবরকম অনুষ্ঠান হত। কত বিয়ে হয়েছে ওই বাড়িতে। তিন জেনেরেশানের ভাইফোঁটা হত। যেকোনো রকম ফ্যামিলি গ্যাদারিং-এর ঠিকানা ছিল আমাদের বাড়ি। কেষ্টপুরে আসার পরেও, জমজমাটের ভার কম্লেও ধার কমে নি। বাবা চলে যাবার পর খানিকটা কমে গিয়েছিল সত্যি। তবে, মা সব্বাইকে বেঁধে রেখেছিল। সব্বার খবর নিত, কার কোন দিন জন্মদিন, অ্যানিভারসারি – সব মনে রাখত; লোকজনদেরও মনে করিয়ে দিত।
মা চলে গেল। করোনা এলো। বাড়ি ফাঁকা। বড় বড় ঘরগুলো গিলতে আসত। সময় সইয়ে দিয়েছে যদিও।
এই বছর, ৮ তারিখ, সেভাবে কাউকে বলি নি; খুব ভেবেছিলাম- মা কে যারা ভালোবাসে, আসবে নিশ্চয়ই। এসেছিল। ঘর সেদিন আমারদের ভর্তি ছিল। কি যে ভালো লাগছিল.....সেই আগের মতন। ফোন পেয়েছি, মেসেজ পেয়েছি মা-এর জন্য।
খুব ইচ্ছে আছে, পরিস্থিতি আরও একটু বেটার হলে, একদিন তোমাদের সবাইকে ডাকব। মায়ের গল্প শুনব; তোমাদের মধ্যে কিভাবে ‘মা’ আছে... বলো। সত্যি, মা’কে খুব কম চিনতাম। মা’ নিজেকে চিনতে দেয় নি। একটু যদি চিনতে পারি ....

Comments
Post a Comment