Skip to main content

৪ঠা ফেব্রুয়ারি

 


কাকা বলেছিল, শ্যামবাজারের মাঝের ঘরের জানলার পাশে বসে “শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা” সামনে খুলে বসলেও দাদার চোখ থাকত কুলুঙ্গির পাশের দরজায়। মেম্মা জানিয়েছিল, কাকুম নাকি মেম্মাকে বলেছিল – ‘তোর দিদি আর আমার দাদা প্রেম করছে’; তারপর থেকে তো মেম্মা নাকি পত্রবাহিকার কাজ পেয়েছিল।
তখনকার উত্তর কলকাতার বাড়িতে প্রতিঘরে ভাড়াটে থাকার সময় যখন ৯৭/১, বিধান সরণীর একঘরে যশোরের অমিয় মুখার্জী তার তিন ছেলে আর মেয়ে নিয়ে বসবাস করছিলেন, সেই সময় রাজশাহীর শ্যামাতোষ বাগচি এলেন তার তিন মেয়ে এবং এক ছেলে নিয়ে থাকতে। অমিয়বাবুর বিচ্ছু বড় ছেলের মনে ধরল শ্যামাতোষবাবুর নিরীহ, শান্ত বড় কন্যাকে। শুনেছি, পৈতের দিন সে ছেলে জেদ ধরেছিল, মাতুকে না দেখলে, সে পৈতেই নেবে না। তারপর তো, শ্যামাতোষবাবু, মৃত্যুশয্যায় নিজে তার অতি প্রিয় মাতুর হাত জহরের হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন।
’৭৬ এর ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, সরস্বতী পুজো ছিল। মন্বন্তরের জন্য উৎসব পালনের বিধিনিষেধও ছিল হরেক রকম। হয়েছিল প্রবল বৃষ্টি আর মাতু-জহরের বিয়ে।
একই বাড়িতে থাকার দরুন, মা বিয়ের বহুদিন আগে থেকেই মুখার্জী পরিবারের সকলের আপন হয়ে গিয়েছিল। তাইতো আমার পিসিরা কেউ আমার মা কে বৌদি বলে না, মাতুদি বলে। আর বাবা তো মায়ের সঅঅব ছোট ছোট ভাই বোনদের প্রিয় জহরদা।
প্রতিবছর বাবা এই দিনে মা কে শাল গিফট করত। সাদা, কালো, নীল, মেরুন, সবুজ – কতরঙ্গের শাল জমে আছে বাড়িতে। বিধাননগর মেলা থেকে এই দিনের জন্য কিনে আনতাম রজনিকলালের বাসনপত্র, নিজের টিউশন করার রোজগার থেকে। সেগুলোর সেটও আজ শেলফে সাজানো। সল্টলেকে থাকতাম যখন – খুব হইচই হত এইদিনে। কেষ্টপুরে আসার পর সেটা কমে গিয়েছিল। তাও আসত – ছোম্মাতো মিস করেই নি ; মামিমনিরাও আসত।
২০১২, বাবার শরীর ভাঙছিল। মনে মনে ধারনা হয়ে গিয়েছিল, বেশিদিন আর যুঝতে পারবে না। দেড় মাসে প্রায় ১১ কেজি ওজন কমে গিয়েছিল।প্ল্যান করেছিলাম, সেইবার এই ৪ তারিখ, বাবাকে সারপ্রাইজ দেব। ফোন করে সবাইকে আসতে বলেছিলাম। মেম্মারাও মালদা থেকে আসবে ঠিক হল। ভাবলাম, বাবার ফরিয়াপুকুরের বন্ধুদেরও আসতে বলি; কিন্তু সেভাবে যোগাযোগ করে উঠতে পারলাম না। ক্যাটারারকে বলে খাবারের অর্ডার দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। বাবাকে বলেছিলাম, আমি অফিস থেকে ফিরে রান্না করব। বাবা অধৈর্য হয়ে পরেছিল। নিজেই বাজার থেকে মাংস, মাছ নিয়ে এসেছিল ওই শরীরেই। তারপর সবাই এসে যাওয়ায়, সব অ্যারেঞ্জমেন্ট দেখে তিনি শান্ত হন। শুধু বকুনি খেয়েছিলাম, আগে জানালে তিনি বাজার করতেন না!!
সে তো গেল সেবার খাওয়াদাওয়ার ব্যাপার। সেইবার হয়তো বাবা ও বুঝেছিল পরের বছর এইদিনটা কাটাতে পারবে না। অসুস্থ শরীরে মা’কে নিয়ে হস্তশিল্প মেলায় গিয়েছিল – কিনে দিয়েছিল একটা বিছানার চাদর। অ্যাভন-এর ক্যাটালগ দেখে একটা আংটি অর্ডার দিয়ে আনিয়ে বলেছিল – আসল তো দিতে পারলাম না, নকলটাই পরো। সামনের মুদি দোকানের রাজুর সাথে পরামর্শ করে কিনে দিয়েছিল মা’কে টাইটানের একটা ঘড়ি, তাও সেটা দেওয়া সেবছর হয়েছিল ভ্যালেন্টাইন ডে র দিন।
সেই বছর ২৮শে এপ্রিল ভোরে যখন খবর পেলাম বাবা ভেন্টিলেটর এ, অলরেডি ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে গেছে- মা ট্যাক্সিতে যেতে যেতে বলেছিল – চলে যাচ্ছে, সব ঠাণ্ডা করে দিয়ে চলে যাচ্ছে; বাইরে বৃষ্টি পরছিল তখন।
তারপরেও প্রতিবছর এই দিনটা পালন করা হত। কেউ না আসলেও ছোম্মা আসত। মায়ের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসত। কিন্তু গত বছর, এইদিনটা সে কাটিয়েছিল কাচের ঘরে, সবার থেকে আলাদা হয়ে, মুখে বাইপ্যাব। মালিনী যখন উইশ করল –‘বড়মাসি, হ্যাপী অ্যানিভারসারি’- সে নাকি চমকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল শুধু; বুঝেছিল কি? কে জানে।
৩রা ফেব্রুয়ারি ছোটদিদা চলে গিয়েছিল। সেইদিনটাই তার ম্যারেজ অ্যানিভারসারি ছিল। মা আর ছোটদিদার তো ভারি মিল ছিল, আমি ভেবেছিলাম মা ও হয়তো সেইদিনই ...... কিন্তু মা গেল চারদিন পর। সেদিনও বৃষ্টি হয়েছিল।
পুরনো কাপড়জামা দেওয়ার জন্য গোছাতে গিয়ে মায়ের একটা ছাপা শাড়ি যেই নিতে গেছি, মা হঠাত বলেছিল – ওইটা দিস না, রেখে দে। কারণ জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল – তোর বাবার সাথে শেষ ছবিতে ওই শাড়িটাই পরে আছি। আমি না, সেদিন আমল দিই নি। বলেছিলাম – এই শাড়ি অন্য অভাবি মানুষ পরলে আরও শান্তি পাবে। এই বলে, শাড়িটা বস্তায় পুরে দিয়েছিলাম অন্য জামাকাপড়ের সাথে। সেইসব গুছিয়ে রাখা পুরনো জামাকাপড়ের বস্তা (কম করে ৭-৮টা) আম্ফানের সময় দিয়ে দিয়েছি। দুদিন আগে, স্টোররুম গোছাতে গিয়ে দেখলাম, একটা পুরনো জামার বস্তা এখনও পরে রয়েছে। খুলে দেখলাম, এইটা সেই বস্তা, যাতে শাড়িটা রয়েছে। অবাক কাণ্ড না?
সেই ’৭৬ থেকে ২০১১ – ৩৫ বছরের দাম্পত্য পেরিয়েছিল অনেক চরাই উৎরাই। কিন্তু মা-বাবার বন্ডিং ছিল অসাধারণ। একবার স্পন্দনের দলের সাথে নাটক করে ফেরার পথে বাবাদের বাস খালে পরে যায়। বাবা বলেছিল – আমার শুধু মাতুকেই মনে পরছিল সেই সময়। সারাদিন ধরে অজস্রবার মাতু-মাতু-মাতু না ডাকলে তার শান্তি ছিল না। আমাকেও বলে গিয়েছিল –‘মা কে দেখিস’। আর দেখতে পারলাম কই...
তোমাদের কাছে মা-বাবার গল্প জমা থাকলে প্লিস শেয়ার কর। ছবি থাকলে – দিও। ভালো লাগবে।




Comments

Popular posts from this blog

‘হো’ওপনোপনো’

কথায় আছে লেটস ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো? ক্ষমা কি করা যায়, যদিও বা যায়... সেটা কি ভোলা সম্ভব? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় একটা বড় ভুমিকা নেয়, দিন যেতে যেতে ঘটনার অনুভুতির তীক্ষতা কমতে থাকে, আমরা মনে করি ‘ভুলে গেছি’; কিন্তু দেখা যায়, সামান্য অনুরূপ কিছু হলে বা মনে পড়লেই দগদগে ভাব নির্লজ্জের মতন বেরিয়ে পরে।  হ্যাঁ, আমিও বলছি, ভালো থাকতে গেলে এই –“ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট” যাদুর মতন কাজ করে। একটা সত্যি ঘটনা বলি আজকে, আমার জীবনের। আমার বাড়ির পাশেই একটা কোচিং সেন্টারে আমার ছেলে পড়ত। ঘটনাক্রমে, সেন্টারহেডের ছেলেও আমার ছেলেরই ক্লাসের বন্ধু। প্রচলিত আছে, সেই সেন্টারহেড (নাম ধরে নিই ‘ক’বাবু) ভালো ছাত্রছাত্রী ছাড়া সেই সেন্টারে পড়ান না। তাই, আমার ছেলে যখন ক্লাস সেভেন (ছেলে আমার বরাবরই ৬০% পাওয়া – ছোটবেলায় লারনিং ডিসঅর্ডার ছিল) তখন তিনি তাকে যোগ্য মনে করেন নি সেই সেন্টারের। ক্লাস নাইনের সময়, আমি দেখলাম, ওর ক্লাসের অনেকজন ওই সেন্টারেই পড়ে আর বাড়ির পাশে বলে, আমারও সুবিধে হবে, অনেকগুলো পথ খরচ বেঁচে যাবে... এইসব ভেবে আবার গেলাম ‘ক’ বাবুর কাছে, অনুরোধ করলাম আমার ছেলেকে ভর্তির জন্য; বদলে ...

শিক্ষা

  একবার হয়েছে কি, ভীষণ উত্তেজনাবশতঃ বেশ কড়া দামে টিকিট কেটে দেখতে গিয়েছিলাম একটা সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। তারপর…. একঘণ্টা যেতে না যেতেই প্রান হাঁসফাঁস, হাত কামড়ানো। মনে যুদ্ধ চলছে – ‘এত খাজা ছবি কি করে হতে পারে’র সাথে ‘ঈশ, কত খরচ হয়ে গেল’র। ভাবতে ভাবতে, পকেট আরও খসিয়ে পপকর্ণ আর কোল্ড্রিঙ্কও খাওয়া হয়ে গেল। হল থেকে বেড়িয়ে কান মুলেছিলাম, এমন বোকামি আর হবে না, শপথ টপথও নিয়েছিলাম খানিক। বলুন তো, আসল বোকামিটা কোনটা ছিল? দামী টিকিট কেটে বাজে সিনেমা দেখা না কি সিনেমাটা বাজে বুঝেও, বেশি খরচ হয়ে গেছে এই ভেবে, হলে বসে নিজের সময় বরবাদ করে পুরো সিনেমাটা হজম করা? নিজেদের জীবনের দিকে একবার ভালো করে তাকাই তো; আমাদের সম্পর্কগুলোও অনেকটা এইরকম নয় কি? কাজ করছে না জেনেও, লেগে থাকি, সম্পর্কের ভার বয়ে চলি অনেক ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গেছে, লোকে কি বলবে… এইসব ভেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে যে সবচেয়ে দামী ইনভেস্টমেন্টটা পাঁকে চলে যাচ্ছে…মানে “সময়”…যেটা আর ফিরে আসবে না, তার কথা ভাবা হয়ে ওঠে না।   কিছুই কিন্তু অপূরণীয় নয়। আপনি না থাকলে, বা আমি না থাকলে সব কি থমকে যাবে? কিছুদিন আগে ইন্সটাগ্রামে একটা পোস্ট দেখে...

নিশিদিন আলোক শিখা জ্বলুক প্রাণে

  জীবনের সবকিছু আমাদের শেখায়। যাদের সাথে দেখা হয়, যাদের সাথে থাকা হয়, যাদের কথা ভাবা হয়, যা যা ঘটে  … সবার থেকে কিছু না কিছু শিখতে পারা যায়। বা, বলা ভালো- শিখতে পারতে হয়, শিখতে জানতে হয়। কারণ, শিখতে পারলে এইসবই আমাদের কাছে “অভিজ্ঞতা” যা জীবন চলতে সাহায্য করে। নতুবা, এগুলোই আমাদের যাবতীয় অ-সুখের কারণ।    তাই, আমাদের প্রতিটা মুহূর্তের ঘটে যাওয়া, ঘটতে থাকা ঘটনাগুলো, ঘটনার কুশীলব সকলেই আমাদের শিক্ষক।   এইসব শিক্ষকদের অবহেলা করবেন না। যখন আপনি মনের মতন চাকরি পাচ্ছেন না, বা যখন কোনও সম্পর্ক প্রশ্নচিহ্নের সামনে, অথবা যখন আপনার বিরুদ্ধে সব ঘটছে, আপনি সমস্যার সম্মুখীন, সেই মুহূর্তে এই শেখার পাঠ আরও বেশি করে মনে করুন। কবি তো বলেই গেছেন কতভাবে – “আরও বেদনা, আরও বেদনা, প্রভু দাও মোরে আরও চেতনা”… “চির পিপাসিত বাসনা-বেদনা, বাঁচাও তাহারে মারিয়া…” “আমি বহু বাসনাই প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে”….. গানগুলো শোনা হয়, গাওয়া হয়, কিন্তু অর্থটাই বোধগম্য হতে পারে না। সমস্যার সময়ে নিজের জীবনের শিক্ষাগুলোকে মনে করে ফেলতে পারলেই কিন্তু সেই পরীক্ষাটা সহজে পাশ করা হয়ে যাবে। যে সব অবস...